ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুধু একটি নতুন সংসদের আনুষ্ঠানিক সূচনা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর জনগণ যে সংসদকে দেশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক মঞ্চ হিসেবে দেখতে চায়, তার যাত্রার শুরুতেই যে বিতর্ক ও অস্বস্তির জন্ম হয়েছে, তা উপেক্ষা করার মতো নয়। কারণ সংসদের প্রথম দিনেই ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় মূল্যবোধ এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সেই ইতিহাস শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রচেতনার কেন্দ্রবিন্দু। তাই সংসদের প্রথম দিনেই যখন মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তা বিস্তর প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা, হত্যা, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এই রাষ্ট্রের নৈতিক দায়। সেই অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সংসদের শোকপ্রস্তাবে স্থান দেওয়া-রাজনৈতিক সমঝোতার যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হলেও-জাতীয় স্মৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য কতটুকু, তা নিয়ে সমাজে গভীর আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।
এই প্রশ্ন আরো সংবেদনশীল হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং দলটি তাকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তুলে ধরে। একই সঙ্গে বর্তমান সংসদের স্পিকারও একজন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। সেই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্য সংসদে শোকপ্রস্তাব গৃহীত হওয়া রাজনৈতিক ও নৈতিক দুই ক্ষেত্রেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। সংসদ যদি জাতির সম্মিলিত বিবেকের প্রতিফলন হয়, তবে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান থাকা জরুরি।
জাতীয় সঙ্গীতের প্রসঙ্গটিও একইভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সংসদে মতভেদ থাকবে, তর্ক থাকবে, রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টিও থাকবে-গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম এটাই। কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন রাষ্ট্রের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতার প্রতীক। সংসদের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের সময় বিরোধী দলের বেশ কিছু সদস্যের দাঁড়িয়ে সম্মান না দেখানোর ঘটনা যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, তা অবহেলার বিষয় নয়। কারণ জাতীয় সঙ্গীত কোনো দলের নয়; এটি জাতির সম্মিলিত আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
এদিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়েও সংসদের প্রথম দিনেই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ একটি বাধ্যতামূলক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। তবে বাস্তবতা হলো, সেই ভাষণ সরকারের পক্ষ থেকেই প্রস্তুত করা হয় এবং তাতে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিফলিত হয়। ফলে যে ভাষণ সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে উপস্থাপিত হলো, তা কতটা রাজনৈতিকভাবে বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল-সেই প্রশ্নও উঠেছে। কারণ রাষ্ট্রপতির কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলিলের অংশ হয়ে যায়।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনের ঘটনাগুলো তাই একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। রাজনীতির স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ও কৌশলের বাইরে এমন কিছু প্রশ্ন রয়েছে, যেখানে আপস বা দ্ব্যর্থতার সুযোগ খুবই সীমিত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় প্রতীক ও সংবিধানের মর্যাদা সেইসব মৌলিক প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত। এসব বিষয়ে অসতর্ক পদক্ষেপ শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এই সংসদের সামনে বড় দায়িত্ব রয়েছে। জনগণ চায় সংসদ হোক জবাবদিহির কেন্দ্র, নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্র এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু শুরুতেই যদি বিতর্ক, অস্বস্তি এবং নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে, তবে সেই প্রত্যাশা পূরণের পথ কঠিন হয়ে পড়ে। রাজনীতির বাস্তবতা যেমন আছে, তেমনি রাষ্ট্রের ইতিহাস ও মূল্যবোধেরও নিজস্ব দাবি রয়েছে। সেই দাবিকে অগ্রাহ্য করে কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান গড়ে ওঠে না।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে অস্পষ্টতা শেষ পর্যন্ত কারো জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো-রাজনৈতিক হিসাবের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধকে সম্মান জানানো। কারণ সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের স্থান নয়; এটি জাতির নৈতিক অবস্থানেরও প্রতীক। সেই প্রতীকের মর্যাদা অটুট রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দায়িত্ব।
সানা/আপ্র/১৩/৩/২০২৬