স্মৃতিভ্রংশের অন্ধকারে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় পরিচিত মানুষ, প্রিয় মুহূর্ত আর স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের জন্য প্রতিটি দিনই হয়ে ওঠে নতুন এক সংগ্রাম। তবে চিকিৎসার পাশাপাশি সংগীতভিত্তিক থেরাপি এখন তাদের জীবনে আশার নতুন আলো হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গবেষণা ও বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পরিচিত গান, পুরোনো দিনের সুর কিংবা প্রিয় বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি ডিমেনশিয়া আক্রান্ত মানুষের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, আবেগ ও অনুভূতিকে জাগিয়ে তুলতে পারে। ফলে তাদের মানসিক স্বস্তি বাড়ে, সামাজিক যোগাযোগ শক্তিশালী হয় এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের সক্ষমতাও উন্নত হয়।
এরই একটি উদাহরণ রোব কাউফম্যান। ষাটের দশকের শুরুতে গুরুতর অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে তিনি কাঠের মেঝেতে পড়ে যান এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। এতে তার মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতজনিত ক্ষতি হয়। দীর্ঘ সময় কোমায় থাকার পর তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয় এবং পরবর্তী সময়ে স্পিচ থেরাপিসহ বিভিন্ন পুনর্বাসন চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কাউফম্যানের স্ত্রী এলেন কাউফম্যান জানান, বর্তমানে তার স্বামী স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিভ্রংশ সমস্যায় ভুগলেও বিভিন্ন চিকিৎসার মধ্যে সংগীত থেরাপিই সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। সংগীতের সঙ্গে কাউফম্যানের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। তিনি একসময় স্টুডিও সংগীতশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন এবং কিংবদন্তি গিটারবাদক জিমি হেন্ডরিক্সের মতো শিল্পীদের সঙ্গেও বাজিয়েছেন।
বর্তমানে নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পরিচালিত একটি বিশেষ সংগীত কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নেন কাউফম্যান দম্পতি। সম্প্রতি কর্মসূচিটির দশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে ক্যালিডোর স্ট্রিং কোয়ার্টেটের পরিবেশনা উপভোগ করেন তারা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রায় একশ দর্শকের মধ্যে অনেককে চোখ বন্ধ করে সুরের সঙ্গে তাল মেলাতে দেখা যায়। কেউ পরিচর্যাকারীর হাত ধরে পিয়ানোর সুর তোলার চেষ্টা করেছেন, আবার কেউ সংগীতের আবেশে হারিয়ে গেছেন স্মৃতির জগতে। পুরো আয়োজন যেন সংগীতের মাধ্যমে হারানো স্মৃতিকে ছুঁয়ে দেখার এক আবেগঘন অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
নিউইয়র্কের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান লিংকন সেন্টার এই ধরনের উদ্যোগের পথিকৃৎ। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা মিরান্ডা হফনার বলেন, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত অনেক দর্শক আগের মতো কনসার্টে অংশ নিতে পারছিলেন না। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই তাদের জন্য বিশেষ এ কর্মসূচি চালু করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমেনশিয়া কোনো একক রোগ নয়; এটি একাধিক জটিল উপসর্গের সমষ্টি, যা মানুষের স্মৃতিশক্তি, চিন্তাশক্তি এবং দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলঝেইমার রোগ এর প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। প্রতিবছর নতুন করে প্রায় এক কোটি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এখনো এর স্থায়ী কোনো চিকিৎসা আবিষ্কৃত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং বয়স্ক জনসংখ্যা বাড়ার কারণে ডিমেনশিয়ার প্রকোপও বাড়ছে। নিউইয়র্ক-প্রেসবিটারিয়ান মেডিকেল সেন্টারের জেরিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞ এমিলি ফিঙ্কেলস্টেইনের মতে, শিল্পকলা, নৃত্য ও বিশেষ করে সংগীতভিত্তিক থেরাপি ডিমেনশিয়া আক্রান্ত মানুষের জন্য উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ এখনো সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে।
লিংকন সেন্টারের কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিচর্যাকারীরা বিনামূল্যে এতে অংশ নিতে পারেন। অংশগ্রহণকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দিতে কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে কর্মশালার মাধ্যমে সংগীতের সাহায্যে আবেগ ও স্মৃতির সঙ্গে নতুন করে সংযোগ তৈরির সুযোগও করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে ৭৩ বছর বয়সী রোব কাউফম্যান মনে করেন, এসব কনসার্ট তার জীবনকে অনেক বেশি স্বাভাবিক করে তুলেছে। তার স্ত্রী এলেনের ভাষায়, সংগীত তার স্বামীর আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কাউফম্যান বলেন, ‘এখানে আসা কারো জীবনই সহজ নয়। তবু অনেক মানুষ প্রিয়জনের পাশে থেকে তাদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা করছেন এবং পুরো যাত্রায় সাহস জোগাচ্ছেন।’
তথ্যসূত্র: এএফপি
এসি/আপ্র/১৬/০৬/২০২৬