অগ্নিঝরা মার্চ আবারও আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে-স্বাধীনতার ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও গৌরবের স্মারক হয়ে। এই মাস বাঙালি জাতিসত্তার ভিত্তি, মুক্তির সংগ্রামের প্রতীক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭১ সালের এই মার্চেই বাঙালি জাতির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যায় এবং শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।
বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। ভাষা আন্দোলনের রক্তস্নাত ইতিহাস, শিক্ষা আন্দোলনের প্রতিবাদ, ছয় দফা আন্দোলনের রাজনৈতিক দাবি এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান-এসব সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাঙালি জাতি স্বাধীনতার পথে অগ্রসর হয়। সেই ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৭১ সালের মার্চে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে জাতিকে স্বাধীনতার সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করা হয়; আর ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম গণহত্যা বাঙালিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য করে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ।
নয় মাসের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। এই ইতিহাস শুধু একটি রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।
কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও ইতিহাস বিকৃতির প্রবণতা থামেনি-এটাই উদ্বেগজনক বাস্তবতা। সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে আমরা দেখেছি-মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা, ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে আড়াল করার নানা প্রবণতা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা জাতির হৃদয়ে গভীর আঘাত হেনেছে। এটি কেবল একটি স্থাপনার ওপর আঘাত নয়-এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের ওপরই আঘাত।
আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো-মুক্তিযুদ্ধের অমর স্লোগান ‘জয় বাংলা’ কিংবা জাতীয় সংগীতের মতো জাতীয় ঐক্যের প্রতীক নিয়েও অযথা বিতর্ক তৈরির চেষ্টা হয়েছে। এসব ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টা এখনো শেষ হয়নি এবং কিছু শক্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টায় সদা তৎপর। যা বর্তমান প্রজন্মের অনেকের মনোজগতকেও প্রভাবিত করছে।
এই বাস্তবতায় অগ্নিঝরা মার্চ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে-আমরা কি আমাদের ইতিহাসের প্রতি যথেষ্ট দায়িত্বশীল? স্বাধীনতার ইতিহাসকে অবমাননা বা বিকৃত করার যে কোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে কি আমরা যথেষ্ট দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছি?
ইতিহাস বলে, যে জাতি তার অতীতকে অস্বীকার করে, সে জাতি ভবিষ্যৎ নির্মাণে শক্ত ভিত্তি খুঁজে পায় না। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষা করা কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্র ও জাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
অগ্নিঝরা মার্চে তাই প্রয়োজন নতুন করে জাতীয় জাগরণ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার প্রতীকসমূহের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে। ইতিহাস বিকৃতির যে কোনো অপচেষ্টা দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করতে হবে।
স্বাধীনতার এই মাসে জাতির স্পষ্ট উচ্চারণ হওয়া উচিত-বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কোনো আপস নেই, কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। রক্তে অর্জিত এই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস রক্ষা করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অমলিনভাবে পৌঁছে দেওয়াই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
সানা/আপ্র/২/৩/২০২৬