সরবরাহ কমে যাওয়ায় বগুড়ার কাঁচামরিচের বাজারে আবারো ঊর্ধ্বমুখী দাম দেখা দিয়েছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বর্তমানে খুচরা বাজারে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ২৩৫ থেকে ২৭০ টাকা কেজি দরে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নতুন মৌসুমের পর্যাপ্ত মরিচ বাজারে না এলে দাম ৩০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
বগুড়ার ফতেহ আলী বাজার, রাজাবাজার ও মহাস্থান এলাকার পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফায় দাম পরিবর্তন হচ্ছে। সরবরাহের ওঠানামার কারণে অনেক সময় একই দিনে পাইকারি বাজারেই প্রতি কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।
ফতেহ আলী বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমান বলেন, রোববার সকালে মহাস্থান থেকে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ১৮০ টাকায় কিনলেও দুপুরে একই মরিচ ২০০ টাকায় কিনতে হয়েছে। বর্তমানে এসব মরিচ খুচরা বাজারে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তার ভাষ্য, নওগাঁ অঞ্চলের মরিচ সবচেয়ে বেশি এলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না।
রাজাবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মোকছেদ আলী জানান, দেশি জাতের কাঁচামরিচ পাইকারিতে ২৩৫ থেকে ২৪০ টাকা এবং উন্নতমানের ‘বিন্দি’ জাতের মরিচ ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে এসব মরিচের দাম ২৬০ থেকে ২৭০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানির এলসি কার্যত বন্ধ থাকায় পুরো বাজার এখন দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। কুষ্টিয়া, নওগাঁ, ঝিনাইদহ ও বগুড়ার উৎপাদিত মরিচ দিয়েই দেশের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। ফলে উৎপাদনে সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেই বাজারে এর বড় প্রভাব পড়ছে।
আরকে ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাজাহান আলী বলেন, নতুন মৌসুমের পর্যাপ্ত মরিচ বাজারে না এলে দাম আরো বাড়তে পারে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, রোগবালাই ও পোকার আক্রমণের কারণে কয়েকটি এলাকায় উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে মৌসুমি উৎপাদনের স্বাভাবিক চক্রের কারণেও সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বগুড়া সদর উপজেলার মরিচচাষি আব্দুল হান্নান বলেন, বাজারে দাম বেশি থাকলেও সব কৃষক এর সুবিধা পাচ্ছেন না। অনেকেই কম দামের সময়ই ক্ষেতের মরিচ বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভও আগের মতো নেই।
শাজাহানপুর উপজেলার কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে মরিচ চাষের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাজার করতে আসা ঢালাই শ্রমিক মিলন বলেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে কাঁচামরিচের দাম এত বেড়েছে যে আগের মতো আধা কেজি বা এক কেজি কেনা সম্ভব হচ্ছে না। আরেক ক্রেতা নান্নু বলেন, কাঁচামরিচ এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর মূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান তিনি।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামসুদ্দিন ফিরোজ বলেন, জেলায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে কাঁচামরিচের আবাদ হয়। বর্তমানে কিছু এলাকায় উৎপাদন কম থাকায় বাজারে প্রভাব পড়েছে। নতুন আবাদ থেকে পর্যাপ্ত মরিচ বাজারে এলে দাম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, মজুতদারি বা অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় প্রতিবছর রবি ও খরিফ মৌসুম মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের কাঁচামরিচের আবাদ হয়। উৎপাদিত মরিচের বড় অংশ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ব্যবসায়ীদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহ বাজারের পরিস্থিতি মূলত নতুন উৎপাদন ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করবে। সরবরাহ না বাড়লে কাঁচামরিচের দাম আরও বাড়তে পারে।
এসি/আপ্র/২৮/০৭/২০২৬