মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশের বাজারে আবারো বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। চলতি বছরের এপ্রিলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এতে সীমিত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৭ শতাংশ। বার্ষিক হিসাবে কিছুটা কমলেও মাসভিত্তিক হিসাবে মূল্যস্ফীতির চাপ স্পষ্টভাবে বেড়েছে। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান আক্রমণকে ঘিরে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। এর প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। গত ১৯ এপ্রিল সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচে। ফলে এলপি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ বেড়ে গিয়ে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিলে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। ভোজ্যতেল, শাকসবজি, ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগি এবং ডিমের দাম বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে।
অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। জ্বালানি, পরিবহন, গ্যাস ও বিভিন্ন সেবার মূল্যবৃদ্ধি এ খাতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধিজনিত। কিন্তু সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়ছে না। এপ্রিল মাসে জাতীয় গড় মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। ফলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর শাকসবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাছ ও মাংসের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির চেয়ে আয় কম হারে বাড়লে মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অনেককে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয় বা ব্যয় সংকোচন করতে হয়।
তারা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল না হলে এবং অভ্যন্তরীণ বাজার তদারকি জোরদার না করা হলে মূল্যস্ফীতি স্বল্পমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। এজন্য জ্বালানি নীতি সমন্বয়, আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার মনিটরিং জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এপ্রিলের পরিসংখ্যান বলছে, মূল্যস্ফীতি কমার যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি; বরং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে দেশের বাজারে চাপ আরো বিস্তৃত হচ্ছে।
সানা/আপ্র/৬/৫/২০২৬