বাংলাদেশে ঘাটতি বাজেটের কারণে সরকারকে নিয়মিত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। রাজস্ব আয়ের ঘাটতি, বাড়তি ব্যয় এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার চাপের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে শুল্ক-কর আদায়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতির কারণে রাজস্ব আয় দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনাও কম। ফলে সরকারি ব্যয়-বিশেষ করে বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি ও উন্নয়ন প্রকল্প-মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। এর মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ৫২ দিনেই ব্যাংক খাত থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই নেওয়া ঋণ ১ লাখ ২২ হাজার ৭ কোটি টাকা।
সরকারের হিসাব ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েজ অ্যান্ড মিনস ও ওভারড্রাফট সুবিধার আওতায় ঋণ নেওয়া হচ্ছে। ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ওয়েজ অ্যান্ড মিনস হিসাবে ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ওভারড্রাফট হিসাবে ২২ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ১৩২ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়া মানে নতুন টাকা সৃষ্টি বা ‘মানি ক্রিয়েশন’। এতে রিজার্ভ মানি বৃদ্ধি পায় এবং এক টাকা থেকে বাজারে প্রায় পাঁচ টাকা পর্যন্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অন্যান্য কারণে জনগণ ইতোমধ্যেই চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর প্রভাব যুক্ত হলে দ্রব্যমূল্য আরো বাড়তে পারে এবং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার মান কমে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে আমদানি ব্যয়ের ওপর। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজনের বেশি টাকা ছাপানো হলে তা সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং সরকারকে সরাসরি ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা। কারণ, স্বল্পমেয়াদে এটি কিছুটা স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে পারে।
সানা/আপ্র/২৫/৪/২০২৬