খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ২৪ হলের ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। এ ঘটনায় হলের ক্যান্টিন কর্মচারী ইমাম হাসানকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে শিক্ষার্থীরা। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে তালা ঝুলিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত বুধবার (২২ জুলাই) রাতে বিজয় ২৪ হলের ওয়াশরুমে একটি সন্দেহজনক মোবাইল ফোন দেখতে পান তারা। পরে বিষয়টি যাচাই করে ওই ফোনে একাধিক গোপন ভিডিও পাওয়া যায় বলে দাবি করেন তারা। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হলের ক্যান্টিন কর্মচারী ইমাম হাসানকে আটক করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে পুলিশে দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীরা জানান, ইমাম হাসান প্রায় দুই বছর ধরে ওই ছাত্রী হলে ক্যান্টিন কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের অভিযোগ, তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে দীর্ঘদিন ধরে ধারণ করা একাধিক গোপন ভিডিও পাওয়া গেছে। এসব ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে ছড়িয়ে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ করেন তারা।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। পরে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদী চত্বরে বড় ধরনের প্রতিবাদ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, এর আগেও যৌন হয়রানির বিভিন্ন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, অতীতের ঘটনাগুলোতে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। অভিযুক্তের বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসের কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন তিনি।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, পকেট গেট ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। একই সঙ্গে ক্লাস বর্জন করেন তারা।
হরিণটানা থানার ওসি হেলাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের মারধরের শিকার হওয়ায় অভিযুক্ত ইমাম হাসানকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার স্ত্রীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ইমাম হাসানের স্ত্রীও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। এ ছাড়া ইমাম হাসানকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়গুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক সহকারী পরিচালক মো. হাসান মাসুদ বলেন, বুধবার রাতের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করেছে। শিক্ষার্থীরা বৃহস্পতিবার ক্লাস বর্জন করে বিভিন্ন স্থানে তালা দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা জানান, ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে হলের বিভিন্ন ব্লকের শিক্ষার্থীরা একত্রিত হন। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হলের ভেতরে আটকে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়।
কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, নারী আবাসিক হলের মতো একটি সংরক্ষিত স্থানে এ ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, নারী হলগুলোতে বহিরাগত ও সেবাদানকারী কর্মীদের প্রবেশে কঠোর নজরদারি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিজয় ২৪ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চান না তিনি। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হবে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২৪/৭/২০২৬