হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে গুরুতর আহত হওয়ার ছয় মাস পর আবারো সুন্দরবনের বনে ফিরছে একটি বাঘিনী। দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা বাঘিনীটিকে রোববার বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্রসংলগ্ন বনাঞ্চলে অবমুক্ত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগ জানিয়েছে, বাঘিনীটির নিরাপদ চলাচল ও আচরণ পর্যবেক্ষণে প্রায় আট কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসানো হচ্ছে ২০টি ট্র্যাপ ক্যামেরা। স্যাটেলাইট কলার সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এসব ক্যামেরার মাধ্যমে তার গতিবিধি নজরদারি করা হবে।
খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, ১০ থেকে ১১ বছর বয়সী বাঘিনীটি বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ। উদ্ধারের সময় এটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও কঙ্কালসার অবস্থায়। চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর এখন তার ওজন স্বাভাবিক হয়েছে এবং হারানো ক্ষিপ্রতা ও চলাফেরার সক্ষমতাও ফিরে এসেছে।
তিনি বলেন, ফাঁদে আটকে পড়ার সময় বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ের প্রায় তিন ইঞ্চি অংশের চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশিতে বারবার টানাটানির কারণে ক্ষতস্থানে পচনও ধরেছিল। নিয়মিত পরিচর্যা, ড্রেসিং ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের মাধ্যমে মার্চ মাসের দিকে ক্ষত পুরোপুরি শুকিয়ে যায়।
বন কর্মকর্তা জানান, অবমুক্ত করার আগে শনিবার বাঘ বিশেষজ্ঞদের একটি দল বাঘিনীটির শারীরিক অবস্থা ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করবে। তাদের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুস্থ হওয়ার পর জুলাই মাসের মধ্যেই বাঘিনীটিকে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে স্যাটেলাইট কলার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ট্র্যাপ ক্যামেরার মাধ্যমে তার চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তিনি বলেন, শুক্রবার সকাল থেকেই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। বাঘিনী অবমুক্ত করার সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবনের পূর্ব অংশের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির আওতাধীন শরকির খালসংলগ্ন এলাকায় হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘিনীটি। খবর পেয়ে পরদিন ট্রাঙ্কুইলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে ফাঁদ কেটে লোহার খাঁচায় করে তাকে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে টানা ছয় মাস চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার পর এখন আবারো নিজের প্রাকৃতিক আবাস সুন্দরবনে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে বাঘিনীটি।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, শিকারিদের অবৈধ ফাঁদ শুধু হরিণ নয়, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্যও বড় হুমকি। এই বাঘিনীর পুনর্বাসন ও পুনরায় বনে ফেরার ঘটনা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১০/৭/২০২৬