আকাশ যেন থামতেই চাইছে না। টানা বর্ষণের অবিরাম ধারা আর উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের একের পর এক জনপদ এখন পানির নিচে। কোথাও নদীর উন্মত্ত স্রোত ভেঙে দিচ্ছে প্রতিরক্ষা বাঁধ, কোথাও মুহূর্তেই তলিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলের মাঠ। বানের পানির সঙ্গে বাঁচার লড়াইয়ে কেউ ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন, কেউ বুক চাপড়ে কাঁদছেন হারানো স্বজনের জন্য। প্রকৃতির এই কঠিন আঘাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে পাহাড়ি ঢলের ভয়াল স্রোত কেড়ে নিয়েছে দুই শিশুর প্রাণ। কক্সবাজারে বন্যার পানিতে ডুবে ও নৌকাডুবিতে প্রাণ হারিয়েছে আরো কয়েকজন। হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। মৌলভীবাজার, রাঙামাটি, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানিবন্দি। কোথাও বিশুদ্ধ পানির সংকট, কোথাও খাবার ও আশ্রয়ের জন্য মানুষের হাহাকার।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের পাঁচটি নদীর পানি নয়টি পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, ১২৭টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে ৭৯টিতে পানি বাড়ছে, ৪৩টিতে কমছে এবং পাঁচটিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।
নদীর পানিতে ডুবছে জনপদ: সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে সাঙ্গু নদী। বান্দরবান পয়েন্টে নদীটির পানি বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার এবং দোহাজারী পয়েন্টে ২৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া মাতামুহুরী, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াই নদীর পানিও বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে।
নদীর পানি শুধু নদীতেই সীমাবদ্ধ নেই, ঢুকে পড়ছে মানুষের ঘরবাড়িতে। অনেক পরিবার রাতের আঁধারে শিশু, বৃদ্ধ ও গবাদিপশু নিয়ে ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। পানির নিচে চলে গেছে বহু এলাকার সড়ক, কৃষিজমি ও বাজার।
কক্সবাজারে তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি: কক্সবাজারে টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ।
বন্যার পানিতে ডুবে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চকরিয়ার কাকারা ইউনিয়নের মাইজ কাকারা এলাকায় দুই বছর বয়সী মোহাম্মদ ওয়াকিম এবং মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের চরপাড়া এলাকায় তিন বছর বয়সী পুষ্প পানিতে ভেসে মারা যায়।
এরই মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার পথে চকরিয়ার বরইতলী এলাকায় নৌকাডুবিতে ১২ বছর বয়সী হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণার মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নৌকায় করে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় তীব্র স্রোতে নৌকাটি ডুবে যায়। তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ এলাকার সড়ক, কৃষিজমি ও চিংড়িঘের পানির নিচে রয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্গত মানুষের জন্য ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করা হয়েছে।
খোয়াইয়ের বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জে দুর্ভোগ: হবিগঞ্জে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় বাঁধ ভেঙে মুহূর্তেই পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাঁও, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণুরামপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের বসতঘর, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। আকস্মিক পানির চাপে অনেক পরিবার গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে দেখছে। হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, দুর্গত মানুষের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চাল, নগদ অর্থ ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
রাঙামাটিতে বিশুদ্ধ পানির সংকট: রাঙামাটিতে টানা বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। জেলার অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। বন্যার পানিতে নলকূপ ও বিশুদ্ধ পানির উৎস তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ও পানির কন্টেইনার বিতরণ করা হচ্ছে। পাহাড়ধসের কারণে কয়েকটি সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সাজেকে আটকে পড়া পর্যটকদের সেনাবাহিনীর সহায়তায় পর্যায়ক্রমে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মৌলভীবাজারে ভাঙন, পানিবন্দি ১৫ হাজার মানুষ: মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর পানি বেড়ে প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে জেলার প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
কমলগঞ্জ ও রাজনগরের বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে। তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, কালভার্ট ও কৃষিজমি। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো মেরামতের চেষ্টা চলছে।
বৃষ্টিতে জলাবদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল: ভারী বর্ষণে সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গাতেও জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। সাতক্ষীরায় ২৪ ঘণ্টায় ২১৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে পৌর এলাকার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়ক, অলিগলি ও অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। চুয়াডাঙ্গায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ১৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা।
সমুদ্রবন্দরে সতর্কসংকেত: বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে।
প্রকৃতির এই দুর্যোগে মানুষের দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তবে বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন লাখো মানুষের একটাই প্রার্থনা-বৃষ্টি থামুক, পানি নামুক, ফিরুক স্বাভাবিক জীবন।
সানা/আপ্র/১০/৭/২০২৬