যে বাড়িতে নতুন বউকে বরণ করার কথা ছিল, সেই বাড়ির আঙিনায় এখন সারি সারি খাটিয়া। একে একে রাখা হয়েছে স্বজনদের নিথর দেহ। চারপাশে অসংখ্য মানুষের ভিড়, কিন্তু নেই কোনো শব্দ—শুধু কান্নার ধ্বনি।
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহলা বুনিয়ায় বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে শুক্রবার সকালে এমনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের ৯ জনসহ মোট ১৪ জন নিহত হন।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক, তার ছেলে বর আহাদুর রহমান সাব্বির এবং নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু।
যে যাত্রা শুরু হয়েছিল বিয়ের আনন্দে, তা শেষ হলো শোকের মিছিলে।
স্তব্ধ বাড়ি, কান্নায় ভাসছে আঙিনা
শুক্রবার সকালে রাজ্জাকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের ভেতরে পরিবারের নিহত চার নারীর মরদেহ রাখা হয়েছে। আর উপজেলা পরিষদ চত্বরে রাখা হয়েছে বাকি পাঁচজনের মরদেহ।
প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, “একসঙ্গে এতগুলো লাশ আগে দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না। যে বাড়িতে আজ আনন্দ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধু কান্না।”
রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার ভাইয়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন। তিনি বলেন, “আমাদের বাড়িতে আজ নতুন বউ আসার কথা ছিল। কিন্তু একটা দুর্ঘটনা সব শেষ করে দিল।”
বিয়ের ঘর থেকে ফেরার পথেই মৃত্যু
জানা যায়, আব্দুর রাজ্জাক তার ছোট ছেলে আহাদুর রহমান সাব্বিরের বিয়ে দেন খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকার আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুর সঙ্গে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকালে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে তারা কনের বাড়িতে যান। দুপুরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নববধূকে নিয়ে মোংলায় ফেরার পথে রামপাল উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় আনন্দের সেই যাত্রা। মোংলার সেই বর ও কনের আর ঘরে ফেরা হলো না।
একই পরিবারের নয়জনের মৃত্যু
বরপক্ষের নিহতরা হলেন—
আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল এবং তাদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম।
অন্যদিকে কনে মার্জিয়া আক্তার মিতু, তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগমের মরদেহ নেওয়া হয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলায়।
নিহতদের মধ্যে মাইক্রোবাস চালক নাইমও রয়েছেন। তার বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে।
এ ঘটনায় আহত একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
‘নয়টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনতে হয়েছে’
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার বলেন,
“আশপাশের নয়টা মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ করে একে একে নয় স্বজনকে রাখা হয়েছে খাটিয়াতে।”
শুক্রবার জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে বলে জানান তিনি।
শোকের ভারে নুয়ে পড়েছে পুরো এলাকা
মোংলা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নুর আলম শেখ বলেন, “এতগুলো মানুষ এক পরিবারের হারিয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে। মানুষ আসছে, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলতে পারছে না।” কথা বলতে বলতে তার চোখও ভিজে ওঠে। ধীর কণ্ঠে তিনি বলেন— “কে কাকে সান্ত্বনা দেবে? এমন মৃত্যুর দায় কার? মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা কি আর আছে?”
দুর্ঘটনায় নিহতদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
মোট নিহত: ১৪ জন
বরপক্ষ (৯ জন)
আহাদুর রহমান সাব্বির (বর)
আব্দুর রাজ্জাক
আব্দুল্লাহ সানি
উম্মে সুমাইয়া ঐশী
সামিউল ইসলাম ফাহিম
ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল
আলিফ
আরফা
ইরাম
কনেপক্ষ (৪ জন)
মার্জিয়া আক্তার মিতু (কনে)
লামিয়া আক্তার
রাশিদা বেগম
আনোয়ারা বেগম
অন্যান্য
নাইম (মাইক্রোবাস চালক)
সানা/আপ্র/১৩/৩/২০২৬