রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্ট নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যে গভীর সন্দেহ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাঁর বাবা বিনয় দাস। তাঁর দাবি, পুলিশ সিদ্ধার্থকে আটক করার সময় তাঁর গায়ে শুধু একটি কালো-ঘিয়া রঙের গেঞ্জি ছিল। ওই নকশার কোনো শার্ট সিদ্ধার্থের কখনো ছিল না।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকালে একটি সংবাদমাধ্যমের স্থানীয় প্রতিনিধি সিদ্ধার্থের পরনের শার্ট নিয়ে জানতে চাইলে তাঁর বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাস একই কথা জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিদ্ধার্থের পরনের শার্টের সঙ্গে রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার ও গোয়েন্দা শাখার প্রধান সনাতন চক্রবর্তীর পরনের শার্টের রং ও নকশার মিল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হওয়ার পর বিষয়টি সামনে আসে।
সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ দাস বলেন, রোববার ভোরে পুলিশ তাঁর ভাইকে আটক করার সময় সিদ্ধার্থের গায়ে ঘিয়া রঙের একটি গেঞ্জি ছিল। ওই ধরনের কোনো শার্ট তাঁর ভাইয়ের কখনো ছিল না। পরে তাঁর ভাই কীভাবে ওই শার্ট পরলেন, তা তাঁরা জানেন না। বিষয়টি পুলিশই ভালো বলতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একই দাবি করেছেন সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস। তাঁর ভাষ্য, শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে পুলিশসহ অনেক লোক জড়ো হওয়ার পর রোববার ভোররাতে পুলিশ তাঁদের বাড়িতে সিদ্ধার্থের খোঁজে আসে। তখন তিনি চাচার বাড়ি থেকে সিদ্ধার্থকে ঘুম থেকে ডেকে এনে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
বিনয় দাস বলেন, সে সময় তাঁর ছেলের গায়ে শুধু একটি গেঞ্জি ছিল। পরে পুলিশ যখন সিদ্ধার্থকে সাংবাদিকদের সামনে নিয়ে আসে, তখন তাঁর গায়ে শার্ট দেখতে পান। ওই শার্ট কার এবং কখন তিনি সেটি পরেছেন, তা তিনি জানেন না। এ ধরনের শার্ট সিদ্ধার্থকে কখনো পরতে দেখেননি বলেও জানান তিনি।
তবে ছেলে নির্দোষ—এমন দাবি না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন বিনয় দাস। তিনি বলেন, তদন্তে তাঁর ছেলে দোষী প্রমাণিত হলে তিনি ছেলের শাস্তিও মেনে নেবেন। একই সঙ্গে ঘটনার আরো তদন্ত চান তিনি।
পুলিশের বক্তব্য
শার্টের বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার ও গোয়েন্দা শাখার প্রধান সনাতন চক্রবর্তী বলেন, আসামির পরনের শার্টটির রং তাঁর শার্টের মতো হলেও দুটির মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি জানান, তাঁর পরনের শার্টটি এখনো তাঁর গায়ে রয়েছে এবং আসামির শার্টটি আসামির কাছেই রয়েছে।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, তাঁর শার্টটি আড়ং থেকে কেনা। একই ধরনের নকশা ও রঙের শার্ট অনেকের কাছেই থাকতে পারে। তাই শুধু রং বা নকশার মিলকে কেন্দ্র করে সন্দেহের কোনো কারণ নেই।
এর আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবেও তিনি বলেন, ঘটনাটির সময় তিনি যে শার্ট পরেছিলেন, এখনো সেটিই তাঁর গায়ে রয়েছে। মাঠে থাকার সময় তোলা তাঁর ছবিও সাংবাদিকদের দেখানো হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই ছবির সঙ্গে বর্তমান পোশাকের মিল রয়েছে। আসামির পরনের শার্টও একই ধরনের রঙের হলেও সেটি আলাদা শার্ট।
সনাতন চক্রবর্তী আরো বলেন, একটি মহল মামলার তদন্তকে বিভ্রান্ত ও ভিন্ন খাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে শার্টের বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এর সঙ্গে চার খুনের ঘটনা, তদন্ত বা আটক ব্যক্তিদের জবানবন্দির কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর পরনের শার্টটি আড়ংয়ের এবং একই নকশার হাজার হাজার শার্ট বাজারে বিক্রি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
চার খুনে দুই যুবক গ্রেফতার
গত শনিবার রাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গণপতি চক্রবর্তী পরিবার নিয়ে ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় বসবাস করতেন। ভবনটির প্রথম ও তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, এক পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক দাবি, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। পরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়।
আটক দুই যুবক হলেন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তাঁরা সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। রোববার ভোরে নগরের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। তাঁদের বাড়ি নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির আশপাশে।
পুলিশ জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি জুয়েলারি দোকানে প্রায় আট বছর ধরে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ যৌথভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত করে তাঁদের শনাক্ত করে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার রাতে রংপুর মহানগর হাকিম রফিকুল ইসলামের আদালতে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রাত ৮টার দিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাঁদের আদালতে নেওয়া হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওসি (তদন্ত) নির্মল চন্দ্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সানা/আপ্র/২৫/৮/২০২৬