অমর একুশে বইমেলার বাইরে বছরের বাকি সময়েও বাংলা একাডেমির স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত বই বিক্রি হয়। তবে প্রতিদিনের বিক্রির চিত্র এক নয়। কোনো কোনো দিন বিক্রি নেমে আসে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায়, আবার বিশেষ কিছু দিনে ওই বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় দে লাখ ড় থেকে দুই লাখ টাকা। আর বছরজুড়ে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় বাংলা একাডেমির প্রকাশিত বিভিন্ন ধরনের অভিধান।
প্রতিদিনের বিক্রি নির্ভর করে দর্শনার্থী, শিক্ষার্থী, গবেষক, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্রয়ের ওপর। সাধারণ কর্মদিবসে বিক্রয়কেন্দ্রে ক্রেতার সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে দৈনিক বিক্রি অনেক সময় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি সংস্থা কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের বই সংগ্রহের সময় একদিনেই দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বই বিক্রি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বিক্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানান, বইমেলার সময় যে বিপুল সংখ্যক পাঠক বাংলা একাডেমির প্রকাশনা কেনেন, তাদের একটি অংশ সারা বছরই প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্রে আসেন। বিশেষ করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, লেখক, ভাষাবিদ এবং চাকরিপ্রার্থীদের নিয়মিত আনাগোনা দেখা যায়।
বাংলা একাডেমির শত শত প্রকাশনার মধ্যে বিক্রির শীর্ষে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অভিধান। বাংলা ভাষার বানান, শব্দের অর্থ, প্রতিশব্দ, উচ্চারণ ও ব্যবহার জানতে এখনো বিপুলসংখ্যক পাঠক বাংলা একাডেমির অভিধানের ওপর নির্ভর করেন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা গবেষক নন, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, সরকারি চাকরির পরীক্ষার্থী এবং ভাষাপ্রেমীরাও নিয়মিত অভিধান সংগ্রহ করেন। ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলা একাডেমির অভিধান দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। অভিধানের পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস, সাহিত্য, গবেষণা, প্রবন্ধ, জীবনী, লোকসাহিত্য এবং শিশু-কিশোর বিষয়ক বইয়েরও উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে।
সপ্তাহের সব দিনের বিক্রি এক রকম হয় না। কোনো কোনো দিন বিক্রয়কেন্দ্রে হাতে গোনা কয়েকজন ক্রেতা আসেন। সেসব দিনে বিক্রি ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। আবার বিশেষ উপলক্ষ, নতুন বই প্রকাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বই সংগ্রহ কিংবা সরকারি ক্রয়াদেশ এলে বিক্রির পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। তখন একদিনেই দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বই বিক্রি হয়। বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়ে যায়। পাঠ্যতালিকা, গবেষণা কিংবা ভাষা-সাহিত্য বিষয়ক রেফারেন্স বই সংগ্রহ করতে তারা বাংলা একাডেমিতে আসেন। এতে বিক্রিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলা একাডেমির পরিচিতি অনেকাংশেই অমর একুশে বইমেলাকে ঘিরে। কিন্তু বইমেলা শেষ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশনা কার্যক্রম, বই বিক্রি, গবেষণা, গ্রন্থাগার সেবা এবং বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক আয়োজন চলতে থাকে। স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্রে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাঠক বই সংগ্রহ করেন। কেউ ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য, কেউ গবেষণার কাজে, আবার কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একসঙ্গে অনেক বই কিনে নিয়ে যান।
ইন্টারনেট ও ডিজিটাল কনটেন্টের বিস্তারের কারণে পড়ার অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। অনেক তথ্য এখন অনলাইনে সহজেই পাওয়া যায়। তারপরও ভাষা, বানান ও গবেষণার ক্ষেত্রে প্রামাণ্য বইয়ের গুরুত্ব কমেনি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা; বিশেষ করে বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার, গবেষণা ও একাডেমিক কাজের জন্য বাংলা একাডেমির প্রকাশিত অভিধান ও গবেষণাগ্রন্থ এখনো পাঠকদের প্রথম সারির পছন্দ। অনলাইনের তথ্যের চেয়ে নির্ভরযোগ্য মুদ্রিত বইয়ের ওপর অনেকেই আস্থা রাখেন।
ভাষা, সাহিত্য ও গবেষণার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি শুধু বই প্রকাশই করছে না; প্রজন্মের পর প্রজন্মের পাঠকের কাছে নির্ভরযোগ্য জ্ঞানভান্ডারও পৌঁছে দিচ্ছে। আর সেই জ্ঞানভান্ডারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাতবদল হচ্ছে অভিধান যা প্রমাণ করে, ডিজিটাল যুগেও বাংলা ভাষার শুদ্ধ চর্চায় মুদ্রিত বইয়ের গুরুত্ব এখনো অটুট।
কেএমএএ/আপ্র/২৪.০৭.২০২৬