যে বয়সে রাজা-রানি আর পরীদের গল্প শোনার কথা, কড়া রোদ মাথায় নিয়ে পাড়ার মাঠে ধুলোবালি মেখে বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করে আনন্দ পাওয়ার কথা- ওই জাদুকরী শৈশব আজ বন্দি হয়ে গেছে একটি কাচের স্ক্রিনে। প্রযুক্তির এ যুগে শিশুরা পৃথিবীকে জানছে ঠিকই কিন্তু ওই জানার পথটি কতা নিরাপদ, কতা মানবিক- এ প্রশ্ন ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে। আজকে সংবাদপত্রের পাতা ওল্টালেই যখন চোখে পড়ে অবোধ শিশুদের ওপর নির্মম নির্যাতন কিংবা খোদ কিশোরদের হাতেই অন্য কোনো শিশুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর, তখন সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদদের আঙুল সরাসরি গিয়ে পড়ছে এই অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির দিকে। এই আধুনিক ডিজিটাল আসক্তি আমাদের অলক্ষে শিশুদের কোমল ও সংবেদনশীল মনস্তত্ত্বে এক গভীর ও ভয়ানক বিকৃতি তৈরি করছে। প্রযুক্তি যেখানে আমাদের জীবনের গতি বাড়িয়েছে, সেখানে এই অতি প্রযুক্তির আলোই যেন গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের কোমল প্রাণ, সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে এক অন্ধকার অবক্ষয়ের দিকে।
বর্তমান যুগের ব্যস্ত কর্মময় জীবনে যৌথ পরিবারের ভাঙন এবং শহুরে জীবনে খেলার মাঠের তীব্র অভাবের কারণে বাবা-মায়েরাও আজ সন্তানের একাকিত্ব ঘোচাতে তাদের হাতে একরকম বাধ্য হয়েই, সন্তানের নিঃসঙ্গতা কাটাতে তুলে দিচ্ছেন একটি ‘ডিজিটাল খেলনা’। ফলে মানুষের ওমের চেয়ে যন্ত্রের কৃত্রিম আলোর সঙ্গে সখ্য বাড়ছে ওদের, আর তাতেই ওরা পিছিয়ে পড়ছে মায়া, ধৈর্য কিংবা মিলেমিশে থাকার চেনা সামাজিক পাঠ থেকে। ইন্টারনেটের অবাধ দুনিয়ায় কৌতূহলবশত স্ক্রল করতে করতে শিশুরা খুব সহজেই তাদের বয়সের অনুপযোগী, অতি-সহিংস এবং প্রাপ্তবয়স্কদের বিকৃত কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের এই অতিনির্ভরতা শিশুদের ভেতর থেকে সহজাত সৃজনশীলতা ও কল্পনার জগৎটাকে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আগেকার দিনে রূপকথার গল্প শুনে শিশুরা মনে মনে যে মায়াবী জগৎ তৈরি করত, আজ রেডিমেড অ্যানিমেশন আর চটকদার ভিডিওর যুগে সেই ভাবনার অবকাশটুকুও হারিয়ে গেছে। মাঠের ধুলোবালির স্পর্শহীন এই যান্ত্রিক জীবন তাদের বাস্তব পৃথিবীর রুক্ষতা ও সৌন্দর্য- কোনোটির সঙ্গেই প্রকৃত পরিচয় হতে দিচ্ছে না। ফলে আবেগহীন এক কৃত্রিম আবহে বেড়ে উঠে তারা সহানুভূতির ভাষা ভুলে যাচ্ছে, যা তাদের সমাজ ও পরিবার থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন এক রোবটে পরিণত করছে। প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের কারণে কোমল মনস্তত্ত্বে গভীর বিকৃতি তৈরি করছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, অনিয়ন্ত্রিত ভার্চুয়াল উদ্দীপনার কারণে শিশুদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ হরমোনের ক্ষরণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যার ফলে তারা বাস্তব জীবনের সাধারণ জিনিসে আর আনন্দ খুঁজে পায় না। বিশেষ করে বিভিন্ন সহিংস অনলাইন গেমের রক্তপাত ও ভার্চুয়াল হিংস্রতা দেখতে দেখতে বাস্তব জীবনের মানবিক অনুভূতিগুলো তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। অন্যের কষ্টের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করার ক্ষমতা হারিয়ে তারা চরম মাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক ও উগ্র হয়ে উঠছে। তাৎক্ষণিক ক্ষোভ বা আবেগের বশে তারা যেকোনো অপরাধ করতেও দ্বিধাবোধ করছে না, কারণ স্ক্রিনের ওপারে বারবার মানুষকে ‘খুন’ করে আবার বাঁচিয়ে তোলার যে অভ্যাস তারা গড়ে তুলেছে, তা তাদের বাস্তব জীবনের মৃত্যুর ভয়াবহতা ও অপরাধবোধকে ভুলিয়ে দিচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমের লাইক-কমেন্টের গোলকধাঁধায় পড়ে তারা যেমন একদিকে তীব্র হীনম্মন্যতা ও মানসিক অবসাদে ভুগছে, তেমনি ইন্টারনেট জগতের ওত পেতে থাকা নানা সাইবার অপরাধীর সহজ শিকারেও পরিণত হচ্ছে। বড়দের মতো শিশুরাও এখন অন্যের ঝলমলে জীবন দেখে নিজের জীবনকে বিচার করতে শিখছে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে বিষণ্নতার মতো সমস্যা তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল ভিডিও, গেম কিংবা শর্ট কনটেন্টের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা শিশুদের মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক উত্তেজনার প্রতি অভ্যস্ত করে তোলে। ফলে সাধারণ আনন্দ, যেমন- বই পড়া, ছবি আঁকা, প্রকৃতি দেখা বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো- এসব ধীরে ধীরে আকর্ষণ হারাতে থাকে। মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যায়, ধৈর্য হ্রাস পায় এবং গভীরভাবে চিন্তা করার সক্ষমতাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অবশ্য প্রযুক্তিকে সব সমস্যার জন্য দায়ী করা অন্যায় হবে। কারণ প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়; বরং এর লাগামহীন ব্যবহারই মূল বিপত্তি। আধুনিক যুগে প্রযুক্তিকে জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভবও নয়, তবে এর অসচেতন ব্যবহার রুখে দেওয়ার দায়িত্ব এখনই পরিবার ও সমাজকে নিতে হবে। সন্তানদের ডিভাইস ব্যবহারে কঠোর নজরদারি ও প্যারেন্টাল কন্ট্রোল নিশ্চিত করার পাশাপাশি মা-বাবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া।
আপ্র/কেএমএএ/০১.০৭.২০২৬