গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

মেনু

বিধবা নারীরা নিরাপত্তাহীনতাসহ সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:০১ পিএম, ০১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২১:৩৮ এএম ২০২৬
বিধবা নারীরা নিরাপত্তাহীনতাসহ সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার
ছবি

ছবি সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ২৩ জুন পালিত হয় আন্তর্জাতিক বিধবা দিবস। কিন্তু বাংলাদেশে এ দিবসটি এখনো খুব একটা আলোচনায় আসে না। অথচ দেশের লাখো নারীর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই দিবসের তাৎপর্য। স্বামী হারানোর শোকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপ- সব মিলিয়ে অনেক বিধবা নারীর জীবন হয়ে ওঠে এক কঠিন সংগ্রামের নাম।

সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৫২ লাখ বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্ত নারী রয়েছেন; যা দেশের মোট বিবাহিত নারীর প্রায় ৯.৫ শতাংশ। এদের বড় একটি অংশের নিয়মিত আয়ের উৎস নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক বিধবা নারীর জমির মালিকানা নেই, তারা অনিয়মিত ও কম মজুরির কাজে নিয়োজিত থাকতে বাধ্য হন।

১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকার বিধবা, স্বামী-পরিত্যক্ত ও অসহায় নারীদের জন্য ভাতা কর্মসূচি চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল দরিদ্র ও অসহায় নারীদের ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবতা হলো- এই ভাতার পরিমাণ এতাই কম যে, একজন নারীর ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা উভয়ই বাড়ানো জরুরি।

সরকারি এক গবেষণায় দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া ৭১.৭ শতাংশ বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্ত নারী দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বামীহীন জীবনযাপন করছেন। এদের মধ্যে ৬০.৬ শতাংশ নারী নিজেদের শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল বা অসুস্থ বলে জানিয়েছেন। আবার ৯৬.১ শতাংশ নারী চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য ভাতার অর্থ ব্যবহার করেন।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোয় এখনো অধিকাংশ পরিবারে পুরুষ সদস্যই প্রধান উপার্জনকারী। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক নারী হঠাৎ করেই আয়ের প্রধান উৎস হারিয়ে ফেলেন। বাল্যবিয়ের কারণে অনেক নারী কর্মদক্ষতা অর্জনের আগেই সংসারজীবনে প্রবেশ করেন। তাই স্বামী হারানোর পর সন্তানদের নিয়ে তাদের অনেকেই চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে যান।এর সঙ্গে যুক্ত হয় সম্পত্তি থেকে বঞ্চনার বিষয়টি।

আইনগতভাবে স্বামীর সম্পত্তিতে অংশীদার হলেও বাস্তবে অনেক বিধবা নারী জমি, বাড়ি কিংবা অন্যান্য সম্পদের ন্যায্য অংশ পান না। আত্মীয়স্বজন কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নানা কৌশলে তাদের অধিকার দখল করে নেন। কোথাও কোথাও দেবর বা ভাশুরেরাও সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করেন।

শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক বৈষম্যও বিধবাদের জীবনের একটি বড় বাস্তবতা। অনেক এলাকায় এখনও তাদের দুর্বল, অসহায় কিংবা পরিবারের বোঝা হিসেবে দেখা হয়। সামাজিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক সিদ্ধান্ত কিংবা বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে অনেক বিধবা নারীকে দূরে রাখা হয়। কুসংস্কার ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের আরও কোণঠাসা করে তোলে।

বিধবাদের পুনর্বিয়ে নিয়েও সমাজে নানা বাধা রয়েছে। বিপত্নীক পুরুষের পুনর্বিবাহকে যেখানে স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়, সেখানে বিধবা নারীর নতুন করে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্তকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক চোখে দেখা হয়। কোথাও কোথাও তাদের নিয়ে অমানবিক কুসংস্কারও প্রচলিত রয়েছে, যা তাদের সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।

অর্থনৈতিক সংকট, একাকিত্ব, সামাজিক অবহেলা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে অনেক বিধবা নারী দীর্ঘমেয়াদি শোক, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগেন। বয়স্ক নারীরা আরও বেশি নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন। নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে তাদের শারীরিক অবস্থাও ক্রমেই অবনতির দিকে যায়।

নিরাপত্তাহীনতাও তাদের জীবনের বড় একটি সমস্যা। একাকী বসবাসকারী অনেক নারী শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা সম্পত্তি দখলের হুমকির মুখে থাকেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিধবারা উচ্ছেদ, উত্তরাধিকার বঞ্চনা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। বাংলাদেশও এ বাস্তবতার বাইরে নয়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ। পরিবারে বিধবা নারীর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, সম্পত্তির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, পুনর্বিবাহে বাধা অপসারণ, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং আইনি সহায়তা বাড়ানো জরুরি। বিধবা নারীরা কারও করুণার পাত্র নন। তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক।

দেশে দেশে বিধবাদের দুরবস্থা: অতীতে স্বামী মারা যাওয়ার পর নারীর পৃথিবী রাতারাতি পালটে যেত নরকে। বিধবাদের দেখা হতো অশুভ, অলক্ষুনে হিসেবে। শুভ কাজে তাদের উপস্থিতি অমঙ্গল ডেকে আনে বলে বিশ্বাস করা হতো। বিয়ে বা যেকোনো উৎসব থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হতো। এখনও কিছু সংস্কৃতিতে বিধবাদের খাওয়া-দাওয়া নিয়ে বৈষম্যমূলক রীতি দেখা যায়। কোথাও তাদের সবার শেষে খেতে ডাকা হয়, কোথাও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে নিরুৎসাহিত করা হয়, আবার কোথাও এমন রীতিও প্রচলিত রয়েছে যা তাদের জন্য অসম্মানজনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।

ভারতীয় উপমহাদেশে এককালে হিন্দু বিধবাদের রঙিন পোশাক পরা নিষেধ ছিল, নিষিদ্ধ ছিল আমিষ খাওয়া। এককালে স্বামী মারা গেলে চুলও কামিয়ে দেওয়া হতো বিধবাদের।

শুধু অতীতে নয়, আফ্রিকার অনেক আদিবাসী সমাজে এখনও বিশ্বাস করা হয়, স্বামীর মৃত্যুর পেছনে স্ত্রীর কোনো না কোনো হাত রয়েছে। ঘানায় দরিদ্র বিধবাদের অবস্থা এখনো বেশ করুণ। দেশটির কিছু এলাকায় বিধবাদের মৃত স্বামীর দেহাবশেষের অংশ ব্যবহার করে তৈরি করা স্যুপ বা খাবার গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়।

ঘানা সরকার বিধবাদের ওপর আরোপিত এসব রীতি সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও, অনেক মানুষ এখনো সেসব প্রথা অনুসরণ করে। মৃতদেহকে গোসল দেয়া হয় যে পানি দিয়ে, সেই পানি মৃতের স্ত্রীকে পান করতে দেয়া হয়। যদিও অনেক বিধবা এখন আর এসব রীতি মানেন না। তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন এমন বিধবারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের বিরুদ্ধে যেতে পারেন না।

পাপুয়া নিউগিনির কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো কোনো পুরুষ হুট করে অসুস্থ হয়ে মারা গেলে তার দায় চাপানো হয় ঘরের নারীর ওপর। তাকে অপবাদ দেওয়া হয় সে জাদুটোনা করে স্বামীকে মেরে ফেলেছে। এরপর চলে অমানবিক নির্যাতন।

কঙ্গো বা উগান্ডার মতো দেশে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর নামে বিধবা নারীদের বাধ্য করা হয় মৃত স্বামীর ভাই বা কোনো অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে রাত কাটাতে, যেন তার ভেতরের ‘অশুভ আত্মা’ দূর হয়।

শুধু আফ্রিকাতেই নয়, ইউরোপের মধ্যযুগীয় সমাজেও এই নির্মমতা দেখা যায়। সেখানে ১৫ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে চার্চ এবং সমাজের প্রভাবশালী পুরুষেরা মিলে ‘উইচ হান্ট’ বা ‘ডাইনি নিধন’ উৎসব শুরু করে। এই শিকারে সবচেয়ে বেশি বলির পাঁঠা বানানো হতো বয়স্ক, নিঃসঙ্গ এবং বিশেষ করে বিধবা নারীদের। কোনো এলাকায় হঠাৎ শিলাবৃষ্টি হলে, ফসল নষ্ট হলে কিংবা গবাদি পশু মারা গেলে কোনো প্রমাণ ছাড়াই সেই নিঃসঙ্গ বিধবাদের দোষী সাব্যস্ত করা হতো। বিজ্ঞান ও ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে তাদের ওপর চলত অকথ্য নির্যাতন। কখনো তাদের হাত-পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো, যদি ভেসে উঠত তবে প্রমাণ হতো তারা ডাইনি! আর তখন তাদের প্রকাশ্য বাজারে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো।

আন্তর্জাতিক বিধবা দিবসের মূল বক্তব্য- একজন নারীর পরিচয় শুধু তার স্বামীর মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। তিনি নিজেই একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ; যার রয়েছে সম্মান, অধিকার ও সম্ভাবনা। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে বিধবা নারীদের প্রতি বৈষম্য ও কুসংস্কারের অবসান ঘটিয়ে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করাই হতে হবে আমাদের অঙ্গীকার।

আপ্র/কেএমএএ/০১.০৭.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

নারী পর্যটকদের পড়তে হয় বাঁকা চাহনি ও অযাচিত প্রশ্নের মুখোমুখি
০১ জুলাই ২০২৬

নারী পর্যটকদের পড়তে হয় বাঁকা চাহনি ও অযাচিত প্রশ্নের মুখোমুখি

পুরুষ যখন একা ঘোরে, তখন সে পর্যটক। কিন্তু নারী যখন একা ঘোরে, সমাজের চোখে সে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে...

ডিজিটাল আসক্তি শিশুদের কোমল মনস্তত্ত্বে তৈরি করছে বিকৃতি
০১ জুলাই ২০২৬

ডিজিটাল আসক্তি শিশুদের কোমল মনস্তত্ত্বে তৈরি করছে বিকৃতি

যে বয়সে রাজা-রানি আর পরীদের গল্প শোনার কথা, কড়া রোদ মাথায় নিয়ে পাড়ার মাঠে ধুলোবালি মেখে বন্ধুদের সঙ্...

সাইবার হয়রানিতে নারীরা লজ্জা-ভয়ে নেন না আইনের আশ্রয়
০১ জুলাই ২০২৬

সাইবার হয়রানিতে নারীরা লজ্জা-ভয়ে নেন না আইনের আশ্রয়

বর্তমান ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। যোগাযোগ, কাজ, ব্যবসা, বিনোদন- সবই এখন হাতের মুঠোয়। কিন্...

পাকিস্তানি নারীদের হাতে তৈরি বিশ্বকাপের ফুটবল
০১ জুলাই ২০২৬

পাকিস্তানি নারীদের হাতে তৈরি বিশ্বকাপের ফুটবল

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রতিটি গোল, পেনাল্টি আর শেষ মুহূর্তের জয়সূচক শট—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ধর্ষণ মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে ধর্ষণের মামলা কিছুটা বেড়েছে বলে যে পরিসংখ্যান দেখা যাচ্ছে, তার অন্যতম কারণ হলো এখন ভুক্তভোগীরা সহজেই মামলা করতে পারছেন। আগে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে মামলা করতে পারতেন না বা করতে চাইতেন না। আপনি কি মনে করেন মন্ত্রীর এই বক্তব্য সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 11 ঘন্টা আগে