ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রীহলগুলোয় রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কার্যকর থাকা সান্ধ্য আইনকে নারী স্বাধীনতার অন্তরায় ও বৈষম্যমূলক হিসেবে অভিহিত করে তা বাতিলের দাবি উঠেছে। ঢাবির নারী শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’র পক্ষ থেকে এই ‘সান্ধ্য আইন’ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন ও সংবাদ সম্মেলন করেছে। তাদের দাবি, ‘ছাত্রীহল ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা, নারী শিক্ষার্থীদের অবাধ চলাচল ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বৈধ আইডি কার্ড দেখিয়ে যে কোনো ছাত্রী হলে প্রবেশ ও রাতে অবস্থানের সুযোগ এবং নারী স্বজনদের (মা-বোন) হলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া।’ পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে পুরনো কৌশল হিসেবে তাকে ঘরের ভেতরে রাখা হয়ে আসছে।
আমাদের সংবিধানে ১৯(১) বলা হয়েছে, সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে সচেষ্ট হতে হবে। ১৯(৩)এ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের আইনের সামনে সমতা ও আইনের সমান আশ্রয় পাওয়ার কথা রয়েছে। ২৮(১) অনুচ্ছেদে শুধু লিঙ্গের কারণে নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আরও সরাসরি ২৮(২) অনুচ্ছেদ বলছে, রাষ্ট্র ও জনজীবনের সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ভোগ করবে। ২৮(৩) অনুচ্ছেদে লিঙ্গের কারণে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের ক্ষেত্রে নাগরিককে বিশেষ বাধা, দায়, বিধিনিষেধ কিংবা শর্তের মধ্যে রাখার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে। ৩১ অনুচ্ছেদ নাগরিকের আইনি সুরক্ষা এবং আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ফলে ছাত্রীহলের সান্ধ্য আইন সমতা ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য সম্পর্কে সংবিধানের বিরুদ্ধাচরণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ও ছাত্রীর জীবনের টাইমফ্রেম যেন আলাদা। একজন ছাত্র লাইব্রেরিতে থাকতে, টিএসসিতে আড্ডা দিতে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এবং সংগঠনের সভা শেষ করে যে কোন সময় হলে ফিরতে পারেন। আর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে তখন সময় গুনতে হয়। কখন হলের দিকে রওনা দেবে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে পারবে কি না, দেরি হলে কী জবাব দেবে; দরজা বন্ধ হয়ে গেলে কী করবে এসব ভাবনায় তাকে তটস্থ থাকতে হয়। একই ক্যাম্পাসে জেন্ডারভিত্তিক যেন দুরকম আইন। আর এখানেই ছাত্রীহলের সান্ধ্য বিধিনিষেধের মূল সমস্যা। একটি প্রতিষ্ঠান পুরুষ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ধরে নিচ্ছে, সর্বাবস্থায় তার নিরাপত্তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তারা সক্ষম। আর নারী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে ওই সিদ্ধান্তের একটি অংশ প্রতিষ্ঠান নিজের হাতে রেখে দিচ্ছে। ফলে রাত দশটা কেবল ঘড়ির সময় হয়ে থাকছে না, নারী ও পুরুষের স্বাধীনতার মাঝখানে টানা যেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সীমারেখা। তারা উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেছে। তাদের দাবিগুলোর কেন্দ্রে রয়েছে নারীর নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার।
ছাত্রজীবন শুধু ক্লাস আর হলে ফেরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সাংস্কৃতিক কাজ, বিতর্ক, চিত্রপ্রদর্শনী, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী- এসব শেষ হতেও দেরি হতে পারে। এ ছাড়া যে কোনো অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক সভা, সাহিত্যচর্চা, বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা সবকিছুই তো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অংশ। কারও আত্মীয়স্বজন, মা-বাবা হসপিটালে ভর্তি হতে পারে। এ ছাড়া কোনো জরুরি ইস্যুও তৈরি হতে পারে বেশি রাত করে হলে ফেরার। এখানে ছাত্রছাত্রী উভয়েই প্রাপ্তবয়স্ক।
নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ যেন ঘরে-বাইরে সব সময়, সব জায়গায়। তবে এসব নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম নাম দেওয়া হয়। যেমন- নিরাপত্তা, সুরক্ষা, শালীনতা, পারিবারিক মর্যাদা কিংবা অভিভাবকত্ব। নারী কখন বাড়ি ফিরবে, কোথায় যাবে, কার সঙ্গে থাকবে, কত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকবে; এসব সিদ্ধান্ত যখন অন্যরা নিতে শুরু করে, তখন সুরক্ষা আর নিয়ন্ত্রণের সীমা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের বিভেদটা খুব স্পষ্ট। ছেলে সন্তানকে বলা হয়, সাবধানে ফিরো। মেয়েকে বলা হয়, সন্ধ্যার আগেই ফিরো। ছেলের নিরাপত্তার জন্য তাকে সতর্ক করা হয়, মেয়ের নিরাপত্তার জন্য তার চলাচল সীমিত করে দেওয়া হয়। এই দুই ব্যবস্থার পার্থক্য গভীর। নারীর বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করার পুরো দায় নারীর ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়েও যদি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসে রাতে একজন নারী নিরাপদ নন ধরে নিয়ে যদি তাকেই হলে আটকে রাখা হয়, তাহলে অনিরাপদ পরিবেশ বদলানোর চাপ কমে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয় যেমন বুয়েট, ঢাকা মেডিক্যাল এসব কোথাও এমন আইন প্রচলিত নেই।
কেএমএএ/আপ্র/১৯.০৮.২০২৬