মানুষের শরীর কখন চর্বি বা মেদ পোড়ানো শুরু করেছে, তা এবার জানা যাবে শুধু নিঃশ্বাস পরীক্ষা করেই। গবেষকরা এমন একটি বহনযোগ্য শ্বাস বিশ্লেষণ যন্ত্র তৈরি করেছেন, যা নিঃশ্বাসে থাকা অ্যাসিটোনের মাত্রা পরিমাপ করে দেহের চর্বি পোড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য দিতে পারবে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই ‘ব্রেথঅ্যানালাইজার’ যন্ত্রটি মানুষের নিঃশ্বাসে থাকা রাসায়নিক উপাদানের মাত্রা বিশ্লেষণ করে শরীরের বিপাকীয় অবস্থা শনাক্ত করতে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী ‘ডিভাইস’-এ প্রকাশিত গবেষণায় এবং ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্ড্রিয়াস গুন্টনারের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই বিশেষ শ্বাস পরীক্ষার যন্ত্র তৈরি করেছেন। গবেষণায় ১২ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর বিভিন্ন খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের পরিস্থিতিতে যন্ত্রটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকদের দাবি, হাতের তালুতে ধরে ব্যবহারযোগ্য এই ছোট যন্ত্রের পরীক্ষার ফল প্রচলিত গবেষণাগারভিত্তিক জটিল পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে প্রায় একই রকম পাওয়া গেছে।
মানুষের শরীরে জমে থাকা চর্বি যখন ভেঙে শক্তিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে, তখন সেই অবস্থাকে বলা হয় কিটোসিস। এ সময় শরীরে কিটোন তৈরি হয় এবং এর একটি উপজাত হলো অ্যাসিটোন, যা নিঃশ্বাসের সঙ্গে বের হয়ে আসে। সাধারণত রক্তে কিটোনের মাত্রা অথবা নিঃশ্বাসে অ্যাসিটোনের পরিমাণ পরিমাপ করে চিকিৎসকেরা শরীরের চর্বি পোড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা নেন।
তবে এত দিন পর্যন্ত নিঃশ্বাসে অ্যাসিটোনের সঠিক মাত্রা নির্ণয়ের জন্য নিয়ন্ত্রিত গবেষণাগার পরিবেশের প্রয়োজন হতো। কারণ বাতাসের আর্দ্রতা, শ্বাস নেওয়ার ধরন এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান পরীক্ষার ফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
নতুন উদ্ভাবিত এই যন্ত্র সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। যন্ত্রটি বাতাসের অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও ক্ষতিকর উপাদান ছেঁকে ফেলতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি মোবাইল অ্যাপ, যা ব্যবহারকারীকে সঠিকভাবে নিঃশ্বাস দেওয়ার পদ্ধতি নির্দেশ করে।
অ্যাপটি ব্যবহারকারীর ফুঁ দেওয়ার চাপ ও সময় পর্যবেক্ষণ করে এবং সঠিক মুহূর্তের বাতাস বিশ্লেষণ করে। ফলে রক্তের পরীক্ষার মতো নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়ার লক্ষ্যেই এটি তৈরি করা হয়েছে।
গবেষকদের তৈরি এই যন্ত্রের বাণিজ্যিক নাম ‘নিউট্রিয়ন’। কাজের দিক থেকে এটি ‘লুমেন’ নামের একটি পুরোনো যন্ত্রের সঙ্গে তুলনীয় হলেও প্রযুক্তিগতভাবে আলাদা। লুমেন যেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বিশ্লেষণ করে বিপাকক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করত, নিউট্রিয়ন সেখানে সরাসরি অ্যাসিটোনের মাত্রা পরিমাপ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরে বসে নিয়মিত নিজের বিপাকক্রিয়ার অবস্থা জানার সুযোগ স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে ওজন কমানোর চিকিৎসায় জেএলপি-১ থেরাপির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ, খাদ্য পরিকল্পনা তৈরি এবং ক্রীড়াবিদদের শরীরের শক্তি ব্যবহারের ধরন বুঝতে এই প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।
তবে গবেষকেরা বলছেন, সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য ব্যাপকভাবে বাজারজাত করার আগে আরো বড় পরিসরে পরীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট
সানা/ডিসি/আপ্র/২৭/৭/২০২৬