বিশ্বকাপ শুরুর আগে ইংল্যান্ড দলে জুড বেলিংহ্যামকে রাখা উচিত কি না-এমন বিতর্কও ছিল। এমনকি প্রথম একাদশে তার জায়গা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। অথচ কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। অসাধারণ পারফরম্যান্সে এখন ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযানের সবচেয়ে বড় ভরসা ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার।
কোয়ার্টার-ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডকে সেমি-ফাইনালে তোলেন বেলিংহ্যাম। ম্যাচ শেষে দর্শকদের কণ্ঠে ভেসে ওঠে বিখ্যাত ‘হেই জুড’ গান। গ্যালারির সেই আবেগঘন মুহূর্তে সতীর্থদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে দেখা যায় তাকেও। মুখজুড়ে ছিল আত্মবিশ্বাস, তৃপ্তি আর অর্জনের হাসি।
শুধু একটি ম্যাচ নয়, পুরো বিশ্বকাপজুড়েই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন রেয়াল মাদ্রিদের এই তারকা। মিডফিল্ডার হয়েও ছয় গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে আছেন। একই সঙ্গে গোল করানো, মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং আক্রমণে কার্যকর উপস্থিতি-সব মিলিয়ে তিনি গোল্ডেন বলেরও অন্যতম দাবিদার।
যে প্রশ্নগুলো এখন ইতিহাস
বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমে বেলিংহ্যামকে ঘিরে নানা আলোচনা ছিল। অভিযোগ উঠেছিল, তিনি নাকি দলের ঐক্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছেন। এমনকি তাকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডের বাইরে রাখার পক্ষেও মত দিয়েছিলেন কেউ কেউ।
কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সেই সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন এই তরুণ। এখন সেই বিতর্কগুলো প্রায় বিস্মৃত।
১৬ বছরেই নজর কেড়েছিলেন
২০১৯ সালের আগস্টে মাত্র ১৬ বছর ৩৮ দিন বয়সে নিজ শহরের ক্লাব বার্মিংহাম সিটির হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয় বেলিংহ্যামের। ক্লাবের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী ফুটবলার হিসেবে রেকর্ড গড়েন তিনি।
অভিষেকের পরই বিভিন্ন ক্লাবের স্কাউটরা তার অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা, দৌড়, কর্মক্ষমতা এবং চাপের মধ্যে বল নিয়ন্ত্রণের দক্ষতায় মুগ্ধ হন। তাদের প্রতিবেদনে তাকে দ্রুত চুক্তিবদ্ধ করার সুপারিশও করা হয়েছিল।
এক বছরের মধ্যেই প্রায় দুই কোটি ৭০ লাখ পাউন্ডে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেন তিনি। মাত্র ৪৪ ম্যাচ খেলেই তার ২২ নম্বর জার্সি অবসরে পাঠায় বার্মিংহাম সিটি-যা ফুটবল ইতিহাসেই বিরল ঘটনা।
ডর্টমুন্ড থেকে জাতীয় দল
ডর্টমুন্ডে অভিষেক ম্যাচেই গোল করেন বেলিংহ্যাম। এরপর দ্রুতই ইংল্যান্ড জাতীয় দলের তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেটের নজরে পড়েন। ২০২০ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হয় তার।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে ইরানের বিপক্ষে দেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে ইংল্যান্ড দলের অপরিহার্য সদস্য হয়ে ওঠেন।
রেয়াল মাদ্রিদে তারকাখ্যাতি
রেয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর প্রথম মৌসুমেই ১৯ গোল করে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বেলিংহ্যাম। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কারণে মাঠের বাইরের নানা বিতর্কও তাকে ঘিরে তৈরি হয়।
পরের মৌসুমে চোট, ফর্মহীনতা এবং ইংল্যান্ডের নতুন কোচ টমাস টুখেলের কিছু মন্তব্যের কারণে তার জাতীয় দল ক্যারিয়ার নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এমনকি এক সময় বিশ্বকাপের প্রথম একাদশেও তার জায়গা নিশ্চিত ছিল না।
বিশ্বকাপেই বদলে গেল সবকিছু
নিউজিল্যান্ড ও কোস্টারিকার বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচ থেকেই আবার নিজের সেরাটা ফিরে পান বেলিংহ্যাম।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দারুণ একক নৈপুণ্যে গোল করেন। পানামার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করে দলকে এগিয়ে নেন। এরপর নকআউট পর্বে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স, মেক্সিকোর বিপক্ষে জোড়া গোল এবং কোয়ার্টার-ফাইনালে নরওয়ের বিপক্ষেও দুই গোল করে নিজের অসাধারণ ফর্মের প্রমাণ দেন।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে টানা দুই ম্যাচে জোড়া গোল করার কীর্তিও গড়েছেন তিনি।
এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে চারবার ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন বেলিংহ্যাম।
শুধু প্রতিভা নয়, পরিণত নেতৃত্বও
মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের সামনে তার পরিণত আচরণও প্রশংসা কুড়িয়েছে। ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলীয় সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। প্রতিপক্ষের প্রশংসা করছেন, সতীর্থদের কৃতিত্ব তুলে ধরছেন এবং মাঠে নেতৃত্বের ভূমিকাও পালন করছেন।
দলের প্রয়োজন অনুযায়ী কখনও আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার, কখনও গভীর মিডফিল্ডে নেমে খেলার সামর্থ্য তাকে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন করে তুলেছে।
মাত্র ২৩ বছর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হয়েছেন বেলিংহ্যাম। বিশ্বকাপের আলোয় তার উত্থান এখন ইংল্যান্ডের শিরোপা স্বপ্নের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। আর সেমি-ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আরেকটি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে নিয়ে যেতে পারে ফুটবল ইতিহাসের আরো উজ্জ্বল এক অধ্যায়ে।
সানা/আপ্র/১৪/৭/২০২৬