বয়স মাত্র ১৩। অথচ আন্তর্জাতিক সাঁতারে এরই মধ্যে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়েছেন চীনের ইউ জিদি। এশিয়ান গেমসে অভিষেকেই সোনা জিতলেন এই কিশোরী। শুধু তাই নয়, ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে গড়েছেন নতুন এশিয়ান গেমস রেকর্ড। রোববার জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত নারীদের ২০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ে ২ মিনিট ৫.০৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে সোনা জেতেন ইউ।
এর মাধ্যমে তিন বছর আগে হাংঝু এশিয়ান গেমসে চীনেরই ঝাং ইউফেইয়ের গড়া রেকর্ড ভেঙে দেন তিনি। হাংঝুতে ঝাং ইউফেই এই ইভেন্টে সোনা জিতেছিলেন ২ মিনিট ৫.৫৭ সেকেন্ড সময় নিয়ে। অর্থাৎ ইউ জিদি তার চেয়ে প্রায় আধা সেকেন্ড কম সময়ে নতুন রেকর্ড গড়েন।
শুধু রেকর্ডই নয়, রুপাজয়ী স্বদেশি চ্যাং মোহানের চেয়ে ৩.৩৬ সেকেন্ড এগিয়ে থেকে প্রতিযোগিতা শেষ করেছেন ইউ। ফলে নিজের এশিয়ান গেমস অভিষেকেই দারুণ ব্যবধানে সোনা জিতেছেন তিনি। এটি ইউ জিদির ক্যারিয়ারের প্রথম বড় কোনো ব্যক্তিগত স্বর্ণপদক। আর এবারের এশিয়ান গেমসে এটি ছিল তার তিনটি ব্যক্তিগত ইভেন্টের প্রথমটি।
ইউ জিদির বয়স এখন ১৩ বছর। আগামী মাসেই ১৪ বছরে পা রাখবেন তিনি। এত অল্প বয়সে এশিয়ান গেমসের মতো বড় মঞ্চে নেমে নিজের প্রথম ইভেন্টেই রেকর্ড গড়ে সোনা জেতা তার ক্যারিয়ারের বিশেষ মাইলফলক। টোকিওতে এশিয়ান গেমসের সাঁতার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে ইউ জিদিকে ঘিরে শুরু থেকেই ছিল বিশেষ আগ্রহ। বিশ্ব সাঁতারে গত বছরই নিজের আগমনের জানান দিয়েছিলেন এই চীনা কিশোরী।
২০২৫ সালের বিশ্ব সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপে মাত্র ১২ বছর বয়সে পদক জিতে ইতিহাস গড়েছিলেন ইউ। চীনের ৪ী২০০ মিটার ফ্রি-স্টাইল রিলে দলের হয়ে ব্রোঞ্জ জিতে তিনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের সাঁতারে সর্বকনিষ্ঠ পদকজয়ী হন। ওই আসরে ব্যক্তিগত তিনটি ইভেন্টেও পদকের খুব কাছে গিয়েছিলেন ইউ। তিনটিতেই চতুর্থ হয়ে অল্পের জন্য ব্রোঞ্জ কিংবা অন্য কোনো পদক থেকে বঞ্চিত হন। তবে সেই হতাশা তাকে থামাতে পারেনি। বরং এরপর আরও দ্রুত এগিয়ে চলেছেন তিনি।
চলতি বছরও ইউ জিদির পারফরম্যান্সে ছিল ধারাবাহিকতা। মার্চে এক প্রতিযোগিতায় তিনি হারিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন রেগান স্মিথকে। এত অল্প বয়সে বিশ্বমানের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইউ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, তাতে ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে তাকে অন্যতম সম্ভাবনাময় প্রতিযোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ছোট চুলের বিশেষ স্টাইলের কারণে সাঁতারের জগতেও আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন ইউ। তবে তার পরিচিতির মূল কারণ অবশ্যই পানিতে তার পারফরম্যান্স।
ইউ জিদির দ্রুত উত্থান যেমন বিস্ময় তৈরি করেছে, তেমনি এত কম বয়সে একজন অ্যাথলেটের ওপর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চাপ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। নিজেও একাধিকবার সেই চাপের কথা বলেছেন ইউ। গতবছর চীনের ন্যাশনাল গেমসের আগে ৪০০ মিটার ব্যক্তিগত মিডলেতে ভালো করার প্রত্যাশা তার জন্য এতটাই চাপ তৈরি করেছিল যে একপর্যায়ে সেটি প্রায় অসহনীয় হয়ে উঠেছিল বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তখন তার কোচ তাকে এগিয়ে যেতে এবং নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই জাতীয় গেমসেই চারটি পদক জিতেছিলেন ইউ। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক সাফল্যের পাশাপাশি মাত্র ১৩ বছর বয়সী এই সাঁতারুকে সামলাতে হচ্ছে বিশাল প্রত্যাশা ও মানসিক চাপও।
ইউ জিদির সাফল্য বিশ্ব সাঁতারে প্রশংসা কুড়ালেও তার দ্রুত উত্থানকে ঘিরে অন্য একটি আলোচনাও সামনে এসেছে। এত অল্প বয়সে একজন অ্যাথলেটের ওপর উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার শারীরিক এবং মানসিক চাপ কতটা উপযুক্ত- তা নিয়ে সাঁতার অঙ্গনে আলোচনা চলছে। বিশ্ব অ্যাকুয়াটিকসের নিয়ম অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণের জন্য সাধারণত একজন সাঁতারুর ন্যূনতম বয়স ১৪ বছর।
তবে নির্দিষ্ট যোগ্যতার মান পূরণ করতে পারলে এর চেয়ে কম বয়সী সাঁতারুরাও বিশেষ ব্যবস্থায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। ইউ জিদি সেই ব্যতিক্রমী প্রতিভাদেরই একজন। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে পদক, ১৩ বছর বয়সে এশিয়ান গেমসে সোনা এবং নতুন রেকর্ড- তার ক্যারিয়ারের শুরুটাই যেন একের পর এক ইতিহাসের গল্প।
ইউ জিদির বয়স যখন ১৫ হবে, তখন ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হবে। ফলে সেখানে তার অংশগ্রহণ এবং পারফরম্যান্স নিয়ে এখন থেকেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে সামনে এখনও দীর্ঘ পথ।
আন্তর্জাতিক সাঁতারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকতে শুধু প্রতিভাই নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক প্রস্তুতি, মানসিক স্থিরতা এবং ধারাবাহিকতা। ইউ জিদির ক্ষেত্রে সেই পরীক্ষাগুলো এখন সামনে।
ডিসি/আপ্র/২০/০৯/২০২৬