গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬

মেনু

এলএনজি বিপর্যয়ে পাঁচ দিনে কমেছে ৪৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস, বেড়েছে লোডশেডিং

গ্যাস সংকটে বিপাকে জনজীবন ও অর্থনীতি

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ২১:৪৬ পিএম, ০১ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ২৩:০৫ এএম ২০২৬
গ্যাস সংকটে বিপাকে জনজীবন ও অর্থনীতি
ছবি

ঢাকায় অধিকাংশ এলাকার বাসাবাড়িতে চুলায় গ্যাসের সরবরাহ অনেক কমে গেছে। কখনো কখনো একদমই জ্বলে না চুলা -ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না, শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত, সিএনজি স্টেশনে রাতভর অপেক্ষা, আর জাতীয় গ্রিডে বাড়ছে বিদ্যুতের চাপ। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী কারিগরি ত্রুটির কারণে সৃষ্ট গ্যাস সংকট এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নেই; এটি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ, শিল্প, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।

জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সিএনজি পরিবহন এবং আবাসিক গ্যাস সরবরাহে।

দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার এই সংকট আবারো সামনে এনেছে আমদানিনির্ভর গ্যাস ব্যবস্থার দুর্বলতা। একটি এলএনজি টার্মিনালের সমস্যায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

পাঁচ দিনে কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ 
দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ পাওয়া যায় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট।

এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে পাওয়া যায় ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট।

কিন্তু মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈদ্যুতিক ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়।

জ্বালানি খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ ছিল প্রায় ৯৯ কোটি ৩৫ লাখ ঘনফুট। পাঁচ দিন পর ২৫ জুলাই তা নেমে আসে ৫০ কোটি ১১ লাখ ঘনফুটে।

অর্থাৎ মাত্র পাঁচ দিনে আমদানি করা গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৯ কোটি ২৪ লাখ ঘনফুট। যা প্রায় অর্ধেক।

এর প্রভাবে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ ২৬৪ কোটি ঘনফুটের বেশি থেকে নেমে এসেছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে। ফলে দৈনিক চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দেশের গ্যাস চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫৬ থেকে ৫৭ শতাংশ।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা, বাড়ছে লোডশেডিং

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমাতে হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ ছিল ৯২ কোটি ৬৮ লাখ ঘনফুট। ২৫ জুলাই তা কমে দাঁড়ায় ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ঘনফুটে।

অর্থাৎ মাত্র পাঁচ দিনে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ কমেছে প্রায় ২২ কোটি ৭৯ লাখ ঘনফুট।

এর ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ১২ কোটি ৫৫ লাখ ইউনিট থেকে কমে প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ ইউনিটে নেমে এসেছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের অংশও ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

গ্যাসের ঘাটতির পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। ২০ জুলাই দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫১১ মেগাওয়াট, উৎপাদন হয়েছে ১৫ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১৭৯ মেগাওয়াট।

কিন্তু ২৫ জুলাই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৬৯৩ মেগাওয়াটে। উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৭৮৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯০৮ মেগাওয়াটে।

ওই দিন রাত ১১টার দিকে দেশে সর্বোচ্চ ৯৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং রেকর্ড করা হয়।

এর মধ্যে ময়মনসিংহে ৩৫৩ মেগাওয়াট, সিলেটে ২০৭ মেগাওয়াট, ঢাকায় ১৬১ মেগাওয়াট এবং খুলনায় ১০১ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে।

বিকল্প জ্বালানিতে বাড়ছে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয়
গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদন।

তথ্য অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক উৎপাদন ১২ কোটি ২৯ লাখ ইউনিট থেকে বেড়ে ১৩ কোটি ৮৬ লাখ ইউনিট হয়েছে।

ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে ব্যয়বহুল এসব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচও বেড়েছে।

২০ জুলাই প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল ৬ টাকা ৩১ পয়সা। পাঁচ দিন পর ২৫ জুলাই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ টাকা ৯ পয়সায়।

অর্থাৎ মাত্র পাঁচ দিনে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭৮ পয়সা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।

রাজধানীর রান্নাঘরে গ্যাস নেই, ভোগান্তি চরমে
এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানীর আবাসিক গ্যাস সরবরাহে। ঢাকার ধানমন্ডি, কলাবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবো, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কাফরুল, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বড় সময় গ্যাসের চাপ থাকছে না।

অনেক বাসাবাড়িতে সকাল ও দুপুরের রান্না করা যাচ্ছে না। কোথাও গভীর রাতে, আবার কোথাও ভোরে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস আসছে। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে রান্নার সময় পরিবর্তন করছে।

বাড্ডার বাসিন্দা কানিজ আক্তার বলেন, ‘গ্যাস এলে তখনই রান্না করতে হয়। অনেক সময় মাঝরাতে উঠে রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিতে হচ্ছে।’

রামপুরার বাসিন্দা মোর্শেদা সেতু বলেন, ‘রাত নয়টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছে। চুলার আগুন এত কম ছিল যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা যায়নি।’

গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক পরিবার ইন্ডাকশন কুকার, বৈদ্যুতিক চুলা ও এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকেছে। এতে আবাসিক বিদ্যুতের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

এলপিজির বাজারেও বাড়ছে চাপ
লাইন গ্যাসের সংকটের কারণে এলপিজির চাহিদা বেড়েছে। তবে অনেক এলাকায় সরবরাহ সংকট এবং অতিরিক্ত দামের অভিযোগ উঠেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, সরকারি নির্ধারিত দামে সব সময় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় দাম বেশি চাওয়া হচ্ছে।’

নিম্ন আয়ের অনেক পরিবার আবার বাধ্য হয়ে কাঠ, কয়লা বা বিকল্প জ্বালানির দিকে ফিরে যাচ্ছে।

শিল্পাঞ্চলে উৎপাদনে ধাক্কা
গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প খাতে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, নিটওয়্যার, সিরামিক, গ্লাস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও বয়লারনির্ভর শিল্পে সমস্যার কথা জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

শিল্প মালিকরা বলছেন, গ্যাসের চাপ ওঠানামা করায় কারখানার যন্ত্রপাতি বারবার বন্ধ ও চালু করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, নষ্ট হচ্ছে সময় এবং রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, তৈরি পোশাক খাতের ডাইং, ওয়াশিং, ফিনিশিং, বয়লার ও স্টিমনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়া সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কমে গেলে শুধু একটি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে। কাঁচামাল সরবরাহ, শ্রমিকদের কাজের ধারাবাহিকতা এবং রপ্তানি প্রস্তুতি সবকিছুতেই সমস্যা তৈরি হয়।’

তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

সিএনজি স্টেশনে রাত কাটছে চালকদের
গ্যাস সংকটের কারণে রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার সারি। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না।

রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে দেখা গেছে, রাত গভীর হওয়ার পরও চালকদের দীর্ঘ লাইন রয়েছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর অল্প পরিমাণ গ্যাস মিলছে।

খিলগাঁওয়ের সিএনজি চালক রফিক বলেন, ‘আগে দিনে একবার গ্যাস নিলেই সারা দিন গাড়ি চালানো যেত। এখন চার-পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যায় না।’

আরেক চালক মোহাম্মদ মিল্লাত বলেন, ‘গ্যাস নিতে গিয়ে অর্ধেক দিন চলে যাচ্ছে। আয় কমে গেছে, কিন্তু গাড়ির খরচ কমেনি।’

চালকদের হিসাবে, স্বাভাবিক সময়ে একজন চালক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে ১২ থেকে ১৫টি ট্রিপ দিতে পারেন। কিন্তু এখন প্রতিদিনের কর্মসময় থেকে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা চলে যাচ্ছে শুধু গ্যাসের অপেক্ষায়।

হারাচ্ছে লাখো কর্মঘণ্টা
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু চালকদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলছে।

যদি এক লাখ চালক প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা করে গ্যাসের লাইনে অপেক্ষা করেন, তাহলে এক দিনেই নষ্ট হচ্ছে প্রায় তিন লাখ কর্মঘণ্টা। আর দুই লাখ চালকের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ছয় লাখ কর্মঘণ্টা।

এই সময়ের অপচয়ের প্রভাব পড়ছে-

* যাত্রী পরিবহন কমে যাওয়া,
* পণ্য পরিবহনে বিলম্ব,
* ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ধীরগতি,
* চালকদের আয় কমে যাওয়া,
* এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা হ্রাসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজি চালকদের দীর্ঘ অপেক্ষা কেবল ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টারও অপচয়।

তিনি বলেন, ‘যখন হাজার হাজার মানুষ উৎপাদনশীল কাজে থাকার পরিবর্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বালানির জন্য অপেক্ষা করেন, তখন এর প্রভাব ধীরে ধীরে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ে।’

তার মতে, পরিবহন ব্যাহত হলে পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হয়, উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।

বাড়ছে যাত্রী ভোগান্তি ও ভাড়া
সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যাত্রীদেরও ভোগান্তি বেড়েছে। অনেক এলাকায় অপেক্ষার সময় বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে ভাড়াও।

বনশ্রীর বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগে বনশ্রী থেকে গুলশান যেতে ২০০ টাকার মতো লাগত। এখন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।’

রামপুরার এক যাত্রী জানান, অ্যাপভিত্তিক পরিবহনেও আগের তুলনায় বেশি ভাড়া দেখাচ্ছে।

‘এটি নীরব রক্তক্ষরণ’
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও ক্যাপসের পরিচালক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, সিএনজি স্টেশনে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করা শুধু সময়ের অপচয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক ধরনের নীরব রক্তক্ষরণ।

তিনি বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে চালকদের ট্রিপ কমে যাচ্ছে, আয় কমছে এবং পরিবহন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নষ্ট হচ্ছে।

তার মতে, এর প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন, পণ্য সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এলএনজি নির্ভরতার বড় সতর্কবার্তা
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি এলএনজি টার্মিনালে সমস্যার কারণে পুরো দেশে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।

একসময় দেশের গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ আসত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, একসময় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন দৈনিক প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি ছিল। বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে দেশীয় উৎপাদন আরো কমলে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে। ফলে একটি টার্মিনাল বা সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলেই বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন-

* বিকল্প এলএনজি গ্রহণ সক্ষমতা তৈরি,
* কৌশলগত গ্যাস মজুত ব্যবস্থা,
* বহুমুখী জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা,
* পাইপলাইন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন,
* নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি,
* এবং গ্যাস ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

সংকট কাটাতে চলছে মেরামত
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বিকল এলএনজি টার্মিনাল সচল করতে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। মেরামত শেষে ধীরে ধীরে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রথম পর্যায়ে দৈনিক ২৮ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে না।

ফলে বর্তমান সংকট শুধু সাময়িক ভোগান্তি নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন ও নগরজীবনের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত।
সানা/আপ্র/০১/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

জুলাই আন্দোলনের দুই বছরে সুশাসনের স্বপ্ন কতদূর
০১ আগস্ট ২০২৬

জুলাই আন্দোলনের দুই বছরে সুশাসনের স্বপ্ন কতদূর

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আকাঙক্ষা ছিল একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসনভিত্তিক রাষ্...

হুতি আতঙ্কে আফ্রিকা ঘুরে আসছে সৌদির তেলবাহী জাহাজ
৩১ জুলাই ২০২৬

হুতি আতঙ্কে আফ্রিকা ঘুরে আসছে সৌদির তেলবাহী জাহাজ

একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম অফিস: মধ্যপ্রাচ্যে হুতি হামলার ঝুঁকির কারণে সৌদি আরব থেকে অপরিশোধিত জ্বালা...

খাবারে তেলাপোকা, চট্টগ্রামে তিন রেস্টুরেন্টকে জরিমানা
২৯ জুলাই ২০২৬

খাবারে তেলাপোকা, চট্টগ্রামে তিন রেস্টুরেন্টকে জরিমানা

অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই