বাঙালির নববর্ষ মানেই পান্তা-ইলিশের ঘ্রাণ, নদীর স্বাদ আর উৎসবের আবহ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বাজারের উত্তাপে। বাজারের বাস্তবতা দেখাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে রাজধানীসহ দেশের মাছের বাজারে এবারও দেখা দিয়েছে ইলিশের আকাল এবং অগ্নিঝড়। অর্থাৎ চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ কম থাকায় সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ইলিশের দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
গত দুই দিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার, ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডের একাধিক কাঁচাবাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল ও কৃষি মার্কেট, শ্যামলী ক্লাব মাঠ কাঁচাবাজার এবং মহাখালী কাঁচা বাজার ঘুরে দেখা যায়-বড় বড় আকারের (১ কেজি ২০০ গ্রাম) ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩০০০ থেকে ৩২০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ২৫০০ থেকে ২৮০০ টাকা। এক কেজি ওজনের ইলিশ ২৬০০ থেকে ২৮০০ টাকা, ৮০০-৯০০ গ্রামের ইলিশ ২৪০০ থেকে ২৬০০ টাকা এবং ছোট আকারের ৩০০-৪০০ গ্রামের ইলিশ ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কেজিতে ৪ থেকে ৬টার যে জাটকা, তাও ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা কেজি।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকার বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশ ইলিশ মাছ সাগরের। পদ্মা, মেঘনা বা অন্য নদীর মাছের যে গোল আকৃতি, তা বর্তমান বাজারে প্রায় অদৃশ্য। ব্যবসায়ীরা জানান, সাগরের মাছের অধিকাংশই আসে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও ভোলা উপকূলীয় অঞ্চল থেকে। এই মাছের অধিকাংশের দেহ চিকন এবং লম্বাকৃতির। পদ্মা-মেঘনা বা যেকোনো মিঠাপানির নদীর ইলিশের তুলনায় এসব ইলিশের স্বাদ-গন্ধ খুবই কম।
ক্রেতার অসন্তোষ, ঐতিহ্য হয়ে উঠছে ব্যয়বহুল: দাম বাড়ার ফলে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ স্পষ্ট। ক্রেতাদের চোখে এখন আনন্দ নয়, বিস্ময়। মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারে মাছ কিনতে আসা রাবেয়া খাতুন বলেন, “প্রতি বছর বৈশাখের আগে ইলিশ কিনি, কিন্তু এবার দাম শুনেই মাথা ঘুরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে এই ঐতিহ্য আমাদের মতো মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।” তিনি আরো বলেন, এবার পছন্দমতো মাছ পাচ্ছি না, উপরন্তু দামও অস্বাভাবিক বেশি। তার অভিযোগ, পহেলা বৈশাখ কেন্দ্র করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত।
ধানমণ্ডি থেকে আসা নয়ন সরকার জানান, যে আকারের ইলিশ প্রতি কেজি ২৬০০ টাকা দিতে হয়েছে, তা তার কাছে অনেক বেশি মনে হয়েছে। তার মতে, সরবরাহ কম থাকায় বাজারে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা নেই। ফলে দামও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। যা যা খুশি নিচ্ছে। তুলনায় একটু ভালো মানের ইলিশের দাম অস্বাভাবিক।
সরবরাহ সংকট ও ব্যবসায়ীদের যুক্তি: ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর জেলেরা আগের মতো ইলিশ পাচ্ছেন না। নদী ও সাগরে মাছের প্রাপ্যতা কম, পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলমান থাকায় বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী শুকুর আলী বলেন, বাজারে পর্যাপ্ত মাছ এলে দাম কম রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু সরবরাহ কম থাকায় চাহিদার চাপ সামলাতে গিয়ে দাম বেড়েছে। মহাখালীর ব্যবসায়ী শামীম হোসেন জানান, বৈশাখ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই চাহিদা বাড়বে এবং দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। শ্যামলীর ব্যবসায়ী ইউসুফ জানালেন, এবার ভালো ইলিশ না পাওয়ায় এখনো ইলিশ মাছ তার দোকানে আনেননি।
জাটকা সংরক্ষণ ও বাজার বাস্তবতা: এদিকে ইলিশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে সরকার ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন করছে। পাশাপাশি ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সাগর ও নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও স্বল্পমেয়াদে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়ে দামে।
মৎস্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১০ ইঞ্চির কম ইলিশ জাটকা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। বাংলাদেশ জাতীয় মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, কার্যকর সংরক্ষণ হলে বছরে চার লাখ মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ উৎপাদন সম্ভব। বর্তমানে উৎপাদন পাঁচ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।
ঐতিহ্য, বাজার ও বাস্তবতার টানাপোড়েন: বিশেষজ্ঞদের মতে, পান্তা-ইলিশ মূলত নগরকেন্দ্রিক আধুনিক সংস্কৃতি, যার সঙ্গে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সরাসরি যোগ নেই। যা নব্বইয়ের দশক থেকে জনপ্রিয় হয়েছে। তবু এই সংস্কৃতিই প্রতি বছর বৈশাখে বাজারে তৈরি করে অদ্ভুত এক উত্তেজনা, যেখানে স্বাদ নয়-দামই হয়ে ওঠে মূল আলোচ্য বিষয়।
বরগুনা, ভোলা, চাঁদপুরসহ উপকূলীয় অঞ্চলেও একই চিত্র-বড় ইলিশের সরবরাহ কম, সংরক্ষিত মাছই বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, চাহিদার চাপ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব-সব মিলিয়ে ইলিশ এখন অনেকটাই বিলাসপণ্যে পরিণত হচ্ছে।
এ অবস্থায় বৈশাখের ঐতিহ্য ধরে রাখতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বাড়তি মূল্য দিতে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-পান্তা-ইলিশ কি ধীরে ধীরে কেবল উচ্চবিত্তের উৎসবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে? নাকি এটি বাঙালির ঐতিহ্য থেকে ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতে চলেছে?
সানা/আপ্র/৮/৪/২০২৬