বাংলাদেশ আবারো এক নির্ণায়ক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। আজকের দিনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল আরেকটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চেতনার গভীর পরীক্ষা; বা গণতন্ত্রের আত্মার পরীক্ষা। ব্যালটের কালি শুকাবে, ফল ঘোষণা হবে, কেউ বিজয়ের উচ্ছ্বাসে ভাসবে, কেউ নীরবে মেনে নেবে পরাজয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাস একটাই প্রশ্ন করবে-এই প্রক্রিয়ায় গণতন্ত্র কি মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকলো?
স্বস্তির জায়গা হলো, ভোটের আগের সময়টাতে দেশ দৃশ্যমান ব্যাপক সহিংসতায় নিমজ্জিত হয়নি। রাজনৈতিক উত্তাপ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটেনি। এটি আশাব্যঞ্জক। প্রত্যাশা, ভোটের দিনও নাগরিকেরা নির্ভয়ে কেন্দ্রে যাবেন, নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন এবং নিরাপদে ঘরে ফিরবেন। গণতন্ত্রের প্রথম শর্তই হলো-নিরাপত্তা ও আস্থা।
তবে অভিজ্ঞতা বলে, আসল পরীক্ষা শুরু হয় ফল ঘোষণার পর। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি দুর্বল প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই দৃশ্যমান-ভোট চলাকালে বর্জন, আর ফল প্রকাশের পর পরাজিতদের পক্ষ থেকে বিজয়ীকে অভিনন্দন না জানিয়ে সরাসরি কারচুপির অভিযোগ ও ভোট বাতিলের দাবি। অভিযোগ অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকার; অনিয়ম হলে তার প্রতিকার চাইতেই হবে। কিন্তু সেই প্রতিকার হতে হবে সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর ভেতরে। জনগণের সামগ্রিক রায়কে অস্বীকার করে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়া গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং আস্থাকে ক্ষয় করে।
উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরাজয়কে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করা রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ। সেখানে বিজয়ী সংযত থাকে, পরাজিত শক্তিশালী বিরোধী দলে পরিণত হয়। কারণ গণতন্ত্র মানে কেবল জয় নয়; কার্যকর বিরোধী দলের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরাজয় সেখানে রাজনৈতিক নির্বাসন নয়, বরং নতুন ভূমিকার সূচনা।
বাংলাদেশেও সেই মানসিক প্রস্তুতি জরুরি। বিজয়ী দলকে মনে রাখতে হবে-রাষ্ট্র কোনো দলের সম্পত্তি নয়; এটি সকল নাগরিকের। পরাজিত দলকে মনে রাখতে হবে-জনগণের রায়ই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত ভিত্তি। সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও নাগরিক নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে উত্তেজনা নয়, সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি জোরদার করা।
সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। ভোটের দিন যেমন নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা প্রয়োজন, তেমনি ফল ঘোষণার পর সম্ভাব্য সহিংসতা রোধে দ্রুত, কঠোর ও পক্ষপাতহীন ভূমিকা অপরিহার্য। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে রাষ্ট্রের নৈতিক অঙ্গীকারের পরীক্ষা।
দল বদলাবে, সরকার বদলাবে-এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু রাষ্ট্রের ভিত, জনগণের আস্থা এবং প্রজাতন্ত্রের মর্যাদা অটুট থাকতে হবে। জয়-পরাজয়ের ক্ষণিক উত্তাপে যদি গণতন্ত্রের আত্মাই ক্ষতবিক্ষত হয়, তবে সেই বিজয়ও অর্থহীন হয়ে যাবে।
ফল যাই হোক, রায় জনগণের। সেই রায় মানার সাহসই হোক আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি, বড় প্রজ্ঞা। এবার অন্তত এমন এক অধ্যায় রচিত হোক, যেখানে বলা যাবে-দল জিতেছে বা হেরেছে, কিন্তু গণতন্ত্র পরাজিত হয়নি।
সানা/আপ্র/১২/২/২০২৬