আজ পঁচিশে বৈশাখ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। কিন্তু এই দিন কেবল একজন কবির জন্মস্মারক নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং মানবিক সভ্যতার পুনর্জাগরণের দিন। এমন এক অস্থির, বিভক্ত ও সংঘাতময় বিশ্বে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষ ক্রমশ মানুষ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—ঠিক সেই সময়েই রবীন্দ্রনাথ নতুন করে হয়ে উঠেছেন আমাদের বিবেকের দীপশিখা।
কারণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম হয়েছিল বলেই বাঙালি কেবল একটি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী হয়ে থাকেনি; একটি সভ্য, সংস্কৃতিবান, শুদ্ধ মানবিক এবং প্রতিবাদী জাতিসত্তায় পরিণত হওয়ার ঐতিহাসিক শক্তি পেয়েছে। তিনি না জন্মালে বাংলা ভাষা হয়তো থাকতো, কিন্তু বাঙালির আত্মার এমন বিশ্বজনীন দীপ্তি জন্ম নিতো কি না, সেই প্রশ্ন আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না শুধু কবি-সাহিত্যস্রষ্টা; তিনি ছিলেন এক গভীর মানবতাবাদী দার্শনিক, সমাজভাবুক এবং একটি সভ্যতার নির্মাতা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে তিনি বিশ্বদরবারে যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন, তা আজও বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক অর্জনগুলোর একটি। তাঁর কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, দর্শন ও শিক্ষাচিন্তা মিলেই নির্মিত হয়েছে আধুনিক বাঙালির মননভূমি। আনন্দে-বেদনায়, প্রেমে-বিরহে, সংগ্রামে-প্রতিবাদে—বাঙালির আবেগের প্রতিটি ভাষা তিনি লিখে গেছেন এমন এক মহিমায়, যা দেড় শতাব্দী পরও বিস্ময়করভাবে জীবন্ত। পৃথিবীর খুব কম জাতিই এমন সৌভাগ্যের অধিকারী, যাদের জাতীয় সংগীত একজন কবির মানবিক চেতনার গভীরতম উচ্চারণ হয়ে ওঠে।
১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’র জন্য নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ শুধু ব্যক্তিগত স্বীকৃতি অর্জন করেননি; তিনি বিশ্বসভায় বাংলা ভাষার আত্মমর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সাহিত্যিক খ্যাতি নয়; মানুষের প্রতি তাঁর অবিচল বিশ্বাস। তিনি এমন এক মানুষ-দর্শনের কবি, যিনি ধর্ম, জাতি, ভূগোল কিংবা বর্ণের সংকীর্ণ সীমারেখা অতিক্রম করে মানুষকেই সভ্যতার চূড়ান্ত সত্য বলে ঘোষণা করেছিলেন। তাই আজও তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ” বাক্যটি কেবল সাহিত্যিক উক্তি নয়; এটি সভ্যতার নৈতিক সংবিধান।
শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসরের নদীমাতৃক জনপদে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন গ্রামীণ মানুষের বঞ্চনা, কৃষকের কান্না, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষ এবং সামাজিক বৈষম্যের নির্মমতা। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে কেবল রোমান্টিক কবি করে তোলেনি; করেছে প্রতিবাদী মানবতাবাদী। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের মুক্তি ধর্মীয় উগ্রতায় নয়, শিক্ষায়; বিভাজনে নয়, সহমর্মিতায়; আধিপত্যে নয়, সম্মিলিত মানবকল্যাণে।
এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ আজও বিপজ্জনকভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন পৃথিবী যুদ্ধ, উগ্রবাদ, ঘৃণা, বর্ণবাদ ও ধর্মান্ধতার বিষে ক্ষতবিক্ষত; যখন মানুষের চেয়ে পরিচয় বড় হয়ে উঠছে; যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিদ্বেষের বাজারে পরিণত হচ্ছে—তখন রবীন্দ্রনাথ আমাদের শেখান হৃদয়ের উদারতা, যুক্তির সৌন্দর্য এবং প্রতিবাদের নৈতিক সাহস। তিনি বাঙালিকে শুধু গান শোনাননি; অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। পাকিস্তানি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রসংগীত যেমন প্রতিরোধের ভাষা হয়েছিল, তেমনি মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর গান ছিল স্বাধীনতার অন্তর্গত শক্তি। তাঁর গান আমাদের জাতীয় সংগীত, তাঁর শব্দে বাঙালির স্বাধীন আত্মার ঘোষণা। তাই রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করা মানে বাঙালির আত্মপরিচয়কে অস্বীকার করা।
দুঃখজনকভাবে আজও এক শ্রেণির সংকীর্ণ মানসিকতা রবীন্দ্রনাথকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করতে চায়। কেউ তাঁকে কেবল অভিজাতের কবি বানাতে চায়, কেউ ধর্মীয় বিদ্বেষের মাপকাঠিতে বিচার করতে চায়। অথচ বাস্তবতা হলো, মুসলিম কৃষকের দুঃখ, প্রান্তিক মানুষের বেদনা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে অগ্রসর কণ্ঠস্বরগুলোর একটি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের পরিচয়ের আগে মানুষ হওয়াই সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য।
রাষ্ট্রীয় আয়োজনে রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন শিক্ষাব্যবস্থা, রাষ্ট্রনীতি ও সামাজিক সংস্কৃতির কেন্দ্রে রবীন্দ্রনাথের মানবিক দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। নতুন প্রজন্মকে তাঁর গান শুধু গাইতে শেখালেই হবে না; তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং বিশ্বমানবতার দর্শনও আত্মস্থ করাতে হবে।
‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’— আজকের বিভক্ত পৃথিবীতে এই উচ্চারণই সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক বার্তা। তাই পঁচিশে বৈশাখের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল উৎসবে নয়; মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যয়ে, অসাম্প্রদায়িক চেতনার পুনর্জাগরণে এবং মানুষের প্রতি অবিচল বিশ্বাসে। রবীন্দ্রনাথ সেখানে আজও আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আলোকস্তম্ভ।
স্পষ্টত, রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন কবির নাম নন; তিনি বাঙালির বিবেকের আরেক নাম। বিভক্ত পৃথিবীর এই বিপন্ন প্রহরে তাই তিনি এখনো মানবতার অনির্বাণ দীপশিখা হয়ে জ্বলছেন—অম্লান, অনিবার্য, অনন্ত।
সানা/আপ্র/৮/৫/২০২৬