আশেক মাহমুদ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি ও পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা আবারো অনিশ্চিত। সংঘাতের সময় ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি তেল ও গ্যাসের পরিবহন রুট এ প্রণালি। প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার ফলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে এশিয়ার বহু দেশে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম চড়া। বাংলাদেশকেও পড়তে হয়েছে মহাসংকটে। দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন খুবই সীমিত। জ্বালানি চাহিদা এতটাই আমদানিনির্ভর যে ৬৫-৭০ শতাংশ জ্বালানি বিদেশ থেকে এবং বাকি ৩০-৩৫ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে আসে। মোট আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল, বাকি ৮০ শতাংশই পরিশোধিত তেল। পরিশোধিত তেলের জন্য আমদানিনির্ভরতা এত বেশি থাকার কারণ দেশে তেল পরিশোধনের প্রতিষ্ঠান মাত্র একটি।
তেল পরিশোধনাগারের সংখ্যা বৃদ্ধি না করায় বেশি দামে আমাদের বিদেশ থেকে পরিশোধিত তেল কিনতে হচ্ছে। ফলে রিজার্ভে চাপ পড়ছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানীকৃত এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ও এলপিজির (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। প্রায় শতভাগ এলএনজি এবং ৬০ শতাংশের বেশি এলপিজি আমদানি করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এসব গ্যাস ও তেল আমদানি করতে হরমুজ প্রণালির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও মালয়েশিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত থেকে আমরা তেল আমদানি করি। এই সময়ে প্রতিটি দেশ তেল সংকটে থাকায় তেল সরবরাহের শৃঙ্খল দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বিশ্বায়নের যুগে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কোনো খাতে আমদানিনির্ভরতা অস্বাভাবিক নয়। সমস্যা হলো আমরা এককেন্দ্রিক নির্ভরতার মধ্যে আছি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ আর ভারতের ছকে চলার পরিপ্রেক্ষিতে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে গেছে। দেশীয় সরকারি কোম্পাীন বাপেক্সকে অনেকটা অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে প্রাকৃতিক গ্যাস অনেক বেশি ব্যবহার করা হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি তথা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারলে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার কমে আসত। দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের হিস্যা ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ করা গেছে। মূলত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিদেশনীতি মেনে নেয়ার কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। অথচ সরকার উদ্যোগ নিলে তিন বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সৌরবিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসতে পারত। কিন্তু হয়নি। এমতাবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প খাত এবং পরিবহন ব্যবস্থায় আমদানীকৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়। এতে আমাদের দেশকে বিদেশী কোম্পানির জ্বালানি বাজারে পরিণত করা হয়েছে। ফলে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে। সেই চাপ সামলাতে কঠিন শর্তযুক্ত বিদেশী ঋণের বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
আমাদের অর্থনীতিতে রফতানিমুখিতা অতি দুর্বল। আমদানী ব্যয় ৭ হাজার ১০০ কোটি ডলার। বাণিজ্য ঘাটতি ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার। তেল ও গ্যাসের চলমান সংকটে রফতানি আয় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ প্রধান রফতানি খাত ‘তৈরি পোশাক’ শিল্প চলছে প্রাকৃতিক গ্যাসে। গ্যাস আমদানিতে সংকট হলে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। দেশের ওষুধ, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের কাঁচামাল হলো পেট্রোকেমিক্যাল। এর মানে আমরা অতিমাত্রায় তেলের ওপর নির্ভরশীল। তেলের সংকটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিল্প উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। দেশীয় প্রয়োজন মেটানোই কঠিন, সেখানে রফতানি বৃদ্ধি কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মাত্রাধিক বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বড় আকার ধারণ করছে। এর চাপে রিজার্ভ অনেক সংকুচিত। সেই রিজার্ভ বাড়াতে বিদেশি ঋণের দ্বারস্থ হতে হবে। তবে এ সময়ে ঋণ ছাড় পাওয়া হবে সময়সাপেক্ষ।
রিজার্ভ সংকটের এ আকালে দেশীয় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা আছে। পেট্রোলিয়ামনির্ভর রাসায়নিক স্যারের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। দেশে সার কারখানা মাত্র ছয়-সাতটি। সারের চাহিদা বছরে প্রায় ৬০-৭০ লাখ টন। এর মধ্যে আমদানি করতে হয় ৪৭ লাখ টন। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকলে আরো বেশি সার আমদানি করতে হবে। বৈশ্বিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে এবং রিজার্ভ সংকটের কারণে সার আমদানি কমে যাবে। এদিকে ডিজেলের সংকট থাকায় সেচের কাজ ব্যাহত হবে ও হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন কমে যাবে। ডিজেল সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। তখন মূল্যস্ফীতি হতে পারে ব্যাপক। এতে খাদ্যের দাম অনেক বাড়তে পারে, খাদ্যের অভাব বাড়বে। এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমস্যা। বৈশ্বিক ও দেশীয় এ সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করা যায় আর কীভাবে জ্বালানি সমস্যার সমাধান করা যায় তার উপায় নিরূপণ করা অত্যাবশ্যক।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে প্রাথমিক উদ্যোগ ও বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা। প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিশিয়াল কর্মদিবস কমিয়ে অনলাইন কার্যক্রম বাড়াতে পারি। শিক্ষা কার্যক্রম অফলাইন-অনলাইনের সমন্বয়ে আপাতত নিয়ে আসতে পারি। কিউআর কোড বা স্মার্ট কার্ডভিত্তিক জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে পারি। জ্বালানি রেশনিংয়ের মাধ্যমে কোন গাড়ি সপ্তাহে কী পরিমাণ জ্বালানি তেল পাবে, তা নির্ধারণ করে জ্বালানি সাশ্রয় করতে পারি। ফিলিং স্টেশন মালিকরা যেন গোপনে জ্বালানি মজুদ ও কালোবাজারি করতে না পারে, তা ব্যাপক নজরদারিতে রাখতে হবে।
অবৈধ জ্বালানি মজুদদারদের জেল-জরিমানা করতে হবে এবং লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। জ্বালানি তেল, এলপিজি, এলএনজির দাম এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে- যেন ফিলিং স্টেশন অবৈধ মজুদে উৎসাহিত না হয়। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য জোড়-বিজোড় নম্বরের প্রাইভেট গাড়ি চলাচল নির্দিষ্ট দিনে সীমিত করা দরকার। ছুটির দিনে প্রাইভেট গাড়ির চলাচল বেশি সীমিত করতে হবে। কঠিন নজরদারি না হলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে পণ্য পরিবহনে, কৃষিতে সেচকাজে এবং ইন্ডাস্ট্রিতে পণ্য উৎপাদনে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ব্যবহারে যেন ঘাটতি না হয়, এদিকে সরকারকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
জ্বালানি তেলের জন্য বিকল্প উৎস অনুসন্ধান করতে হবে দ্রুত। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমিয়ে সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে বেশি দামে হলেও বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাড়াতে হবে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে ডিজেল আমদানি করা যেতে পারে। এছাড়া রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া ও ইউরোপের কিছু দেশ থেকে এলপিজি এবং এলএনজি কেনা যায়। এসব বিকল্প বাজারের মূল্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনামাফিক উদ্যোগ নিতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিধি বাড়াতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য করছাড়, সহজ ঋণ এবং গ্যারান্টি সুবিধা দিলে বড় আকারের সৌর প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ হবে। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পূরণ করা যাবে। তবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য। জ্বালানি খাতের জন্য নিজস্ব নীতিমালা গড়তে হবে।
বিশ্ব এখন দ্বিমেরুকরণের দিকে চলছে। স্বকীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে কূটনৈতিক পন্থায় চীন, রাশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া ও জাপানের মতো পক্ষের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে হবে। এসব দেশের কোম্পানির সহায়তায় বাপেক্সকে শক্তিশালী করতে হবে। তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। গ্যাস উত্তোলন বাড়িয়ে আমদানির পরিমাণ কমাতে হবে। পেট্রোকেমিক্যালজাত পণ্যের (যেমন- প্লাস্টিক, সিন্থেটিক ফাইবার, সার, রাসায়নিক দ্রব্য) আমদানি কমিয়ে বায়োপ্লাস্টিক, পাটজাতীয় ব্যাগ, পুরনো প্লাস্টিকের রিসাইক্লিং পণ্য, জৈব সার ও সৌরশক্তিনির্ভর প্রযুক্তির দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে পারলে তেলের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে। রফতানিমুখী বাজারের পরিসর বাড়াতে পারলে জ্বালানিনির্ভরতা কমে আসবে।
বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপথ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারলে আর আমাদের আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তকে জনবান্ধব করলে জালানি সংকট মোকাবিলা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন স্বনির্ভর ও স্বকীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
আপ্র/কেএমএএ/০৩.০৫.২০২৬