কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে শিগগিরই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না।
শনিবার (৪ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি সরকার ও জনগণ উভয় পক্ষ থেকেই এসেছে এবং সে বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, “ইনশাআল্লাহ খুব শিগগিরই রাজনৈতিক দল হিসেবে সেই সংগঠনকে বিচারের কাঠগড়ায় আনা হবে।”
তিনি আরো বলেন, সংবিধানের ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন সংশোধন করা হয়েছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় রাজনৈতিক দলের বিচার করার বিধান রয়েছে। তাই এ বিষয়ে অপেক্ষা করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্যে তিনি বলেন, “জুলাই বিপ্লবের চেতনা নিয়ে কেউ যেন ব্যবসা না করে। যারা এই চেতনা বিক্রি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়, তাদের পরিণতি ভবিষ্যতে জাতি দেখবে।”
তিনি অতীত রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “যারা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করেছিল, তারা আজ বিদেশে অবস্থান করছে। জনগণ তাদের উৎখাত করেছে।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং চেতনা বিক্রি করে রাজনীতি করা উচিত নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ও শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে কীভাবে স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটেছিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন ফ্যাসিবাদী আচরণ না করে।
শহীদদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, শহীদ ওয়াসিম আকরাম মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ওই তরুণের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা।
তিনি শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে বিচার দাবি প্রসঙ্গে বলেন, “প্রত্যেক হত্যার বিচার আমরা দেখতে চাই। এই দেশে প্রতিটি হত্যার বিচার হওয়া উচিত।”
অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, দেশে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংক্রান্ত একাধিক মামলার রায় ইতোমধ্যে হয়েছে, অনেক মামলা বিচারাধীন এবং আরো অনেক মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, শহীদ আবু সাঈদের মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন ঘটনায় বিভিন্ন পর্যায়ের সাজা হয়েছে।
তিনি আরো উল্লেখ করেন, আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডসহ একাধিক সাজা হয়েছে এবং চাঁনখারপুল হত্যাকাণ্ডেও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। রামপুরা ও অন্যান্য ঘটনায়ও একাধিক রায় হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সর্বশেষ মামলায় হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে, তবে বাদীপক্ষ এতে সন্তুষ্ট নয় এবং আপিল করা হবে।
তিনি দাবি করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে সাজা কম হয়েছে।
তিনি বলেন, “জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ১৪০০ জন শহীদের কথা বলা হলেও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও জরিপে ৭০০ থেকে ৮০০ জনের হিসাব পাওয়া যায়। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে, কারণ অনেকের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়নি এবং অনেককে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।”
বিএনপির ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি ও তারেক রহমান আন্দোলনের সময় নির্বাসিত থাকলেও আন্দোলনকে সংগঠিত করতে নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে তারা ‘স্বৈরাচারের পদত্যাগ’ দাবি উত্থাপন করেন।
তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলনের সময় যারা নেতৃত্ব দাবি করছেন, তাদের অনেকেই তখন রাজনৈতিক দাবি না করে কেবল বৈষম্যহীনতার কথা বলেছিলেন। আমরা তখন রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলাম।”
তিনি আরো বলেন, “শত সহস্র শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা আজ এই অবস্থানে এসেছি। ৫ আগস্টের বিজয় এসেছে সেই ত্যাগের মাধ্যমে।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। আরো বক্তব্য দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়নমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।
এছাড়া শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করেন এবং ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান।
সানা/এসি/আপ্র/৪/৭/২০২৬