জাতিকে বিভক্ত রেখে কোনো দেশের টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দল-মত নির্বিশেষে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘জুলাই ’২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যাদের হারিয়েছি এবং যারা আন্দোলনে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সবার লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনই দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন। আজ আমাদের সামনে সেই সুযোগ এসেছে। আমরা জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে সামনে এগোতে চাই না। কারণ, জাতিকে বিভক্ত করে কখনো দেশকে সামনে নেওয়া যায় না। সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলেই দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’
তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের অর্জন কোনো ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের নয়; এটি দল-মত নির্বিশেষে দেশের সব গণতন্ত্রকামী ও শান্তিপ্রিয় মানুষের সম্মিলিত অর্জন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৫ আগস্ট যে অর্জন আমরা করেছি, সেটি কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নয়। এই অর্জন বাংলাদেশের প্রতিটি গণতন্ত্রকামী মানুষের। এই অর্জন অর্জন করতে গিয়ে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন এবং চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন।’
শহীদ শিশুদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ: জুলাই আন্দোলনে প্রাণ হারানো শিশুদের স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু নিহত হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘তাদের কোনো অপরাধ ছিল না। কিন্তু দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করার আন্দোলনে যেভাবেই হোক, এই শিশুরা জীবন দিয়েছে। তাদের আত্মত্যাগ জাতি কখনো ভুলবে না।’
নিহত ও আহতের সংখ্যা নিয়ে বক্তব্য: প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর ব্যক্তিগত মূল্যায়ন অনুযায়ী, শুধু জুলাই আন্দোলনেই প্রায় দুই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আত্মত্যাগের মূল্যায়ন ও বিচার নিশ্চিতের অঙ্গীকার: জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র তাদের আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
তিনি বলেন, ‘আপনাদের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্র সম্মানের সঙ্গে মূল্যায়ন করবে। একই সঙ্গে যাদের কারণে আপনাদের স্বজন প্রাণ হারিয়েছেন, যারা অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার হবে।’
তবে বিচারের নামে যেন কোনো নিরপরাধ মানুষ অবিচারের শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
‘আমাদের মনে রাখতে হবে, বিচার করতে গিয়ে যেন আমরা নিজেরাই অন্যায় না করি। প্রয়োজন হলে কিছুটা সময় লাগবে, কিন্তু আইন ও ন্যায়বিচারের সব নীতি অনুসরণ করেই প্রকৃত অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’
ত্যাগের প্রকৃত মূল্য দেশ গঠনে: প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের সব ধরনের সহযোগিতার পরও হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘আপনারা যা দাবি করেছেন, রাষ্ট্র যদি সবই পূরণ করে, তারপরও যাকে হারিয়েছেন, তাকে কি ফিরে পাবেন? যে চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন, যে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন, তা কি পুরোপুরি মুছে যাবে? যাবে না।’
তবে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই শহীদদের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘যদি আমরা দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গর্ব করে বলতে পারবেন-আপনজনের আত্মত্যাগ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। সেটিই হবে তাদের আত্মত্যাগের সবচেয়ে বড় সম্মান।’
শহীদ পরিবারের প্রতি সমবেদনা: অনুষ্ঠানে উপস্থিত শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক মা নিজের সন্তানের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছেন, অনেক ভাই নিজের ভাইকে হারিয়েছেন। এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘আপনাদের কষ্ট আমি অনুভব করি। শারীরিক ও মানসিক যে যন্ত্রণা আপনারা বহন করছেন, তার গভীরতা উপলব্ধি করি। আপনাদের এই ত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
দেশ ও জনগণই হোক সবার অঙ্গীকার: প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দেশের ঐক্য, গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাস করে। দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য আমি নয়, আমরা। আমাদের মূল উদ্দেশ্য দেশ, আর আমাদের মূল লক্ষ্য দেশের জনগণ। জুলাই অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন এবং গত ১৭ বছরে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে যে লক্ষ্য নিয়ে তারা সংগ্রাম করেছেন, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হবে। আজকের এই আয়োজন থেকে সেটিই হোক আমাদের শপথ।’
অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহত কয়েকজনের পরিবারের সদস্যদের হাতে স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/এসি/আপ্র/৪/৭/২০২৬