কিছু ফুটবলার ট্রফি জিতে কিংবদন্তি হন, আবার কেউ ট্রফি ছাড়াই হয়ে ওঠেন ইতিহাস। কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা ঠিক সেই দ্বিতীয় শ্রেণির এক অনন্য নাম-যিনি জয় না পেলেও বিশ্ব ফুটবলে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন।
পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের সাও ভিসেন্তে দ্বীপের মিন্ডেলো শহরে ১৯৮৬ সালের ৩ জুন জন্ম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াজের। বিশ্ব তাকে চেনে ভোজিনহা নামে। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল দেশের জার্সিতে বিশ্বমঞ্চে খেলা, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে।
শৈশব ছিল কষ্ট আর দায়িত্বের ভেতর দিয়ে গড়া। বাবা সামরিক বাহিনীতে থাকায় এবং মা দীর্ঘ সময় কাজ করায় ভোজিনহা বড় হন দাদা-দাদির স্নেহে। পাড়ার বড় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে শারীরিকভাবে পিছিয়ে পড়লেও সেই লড়াইই তাকে শক্ত করে তোলে। দাদির আদরের ছেলে হিসেবে পরিচিত ‘ভোজিনহা’ নামটিই একসময় হয়ে ওঠে তার পরিচয়।
শুরুর দিকে স্ট্রাইকার হতে চাইলেও ভাগ্য তাকে নিয়ে যায় গোলপোস্টের নিচে। সেখানেই গড়ে ওঠে তার আসল পরিচয়। স্থানীয় ক্লাব বাতুকে এফসি থেকে শুরু করে ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন ক্লাবে খেলে পেশাদার ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন তিনি। ২০১২ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর হয়ে ওঠেন কেপ ভার্দের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ।
২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই অসাধারণ পারফরম্যান্সে বিশ্বকে চমকে দেন ভোজিনহা। সেদিন করেন সাতটি দুর্দান্ত সেভ, ম্যাচ শেষ হয় গোলশূন্য ড্রয়ে এবং তিনি নির্বাচিত হন সেরা খেলোয়াড়। এরপর আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও তিনি দাঁড়িয়ে যান প্রতিরোধের দেয়াল হয়ে, করেন আটটি সেভ। শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ ব্যবধানে হারলেও ম্যাচের নায়ক ছিলেন তিনিই।
২০২৪ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও কেপ ভার্দের সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই গোলরক্ষক। বাছাইপর্বে ১০ ম্যাচে মাত্র ৮ গোল হজম করে ৭টি ক্লিন শিট এনে দিয়ে দলকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে তোলেন তিনি।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লড়াইয়ের পর ভোজিনহা বলেন, যারা তাকে গড়ে তুলেছেন সেই দাদা-দাদি আর বেঁচে নেই, বিশ্বমঞ্চে তার খেলা দেখে যেতে পারেননি-এই আক্ষেপই তাকে আরো আবেগপ্রবণ করে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোজিনহা গল্প শুধু একজন গোলরক্ষকের নয়, বরং ছোট দেশের বড় স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশের আকার ছোট হলেও স্বপ্ন কখনও ছোট হয় না।
আজ হয়তো তার বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ, কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে তিনি রয়ে যাবেন সাহস, আত্মত্যাগ এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রতীক হিসেবে। কিছু নায়ক ট্রফি জেতেন, আর কিছু নায়ক ইতিহাসে জায়গা করে নেন মানুষের হৃদয়ে-ভোজিনহা সেই দ্বিতীয় দলেরই একজন।
সানা/ডিসি/আপ্র/৪/৭/২০২৬