‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’-এ ধরনের বক্তব্যকে জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে উল্লেখ করে এ ধরনের রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, জনগণ ভোটের মাধ্যমে বিএনপিকে পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সেই রায়ের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে, তারা জনগণের স্বার্থে নয়, নিজেদের স্বার্থে কথা বলে। অতীতেও তারা গণতন্ত্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করেছে, এখনও একই পথে হাঁটছে।
বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল জনসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি আগামী পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করবে। জনগণ বিএনপিকে সময় দিয়েছে দেশ গড়ার জন্য, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। তাহলে যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তারা কার বিরুদ্ধে কথা বলছে? তারা জনগণের রায়ের বিরুদ্ধেই কথা বলছে।”
বিরোধীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “মনে আছে তো একাত্তরে কী করেছিল? মনে আছে ৮৬-তে কী করেছিল? গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ আন্দোলনের সময় তাদের কোথাও দেখা যায়নি। অথচ এখন আবার তারা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে।”
‘আন্দোলনের নামে নতুন ষড়যন্ত্র মেনে নেওয়া হবে না’: তারেক রহমান বলেন, অতীতের মতো আবারও কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী সরকারকে অস্থিতিশীল করতে মাঠে নেমেছে। তারা উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ব্যাহত করার অপচেষ্টা করছে।
“অতীতে বিএনপিকে এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না বলে যারা হুমকি দিয়েছিল, আজও তারাই সরকারকে সময় না দেওয়ার কথা বলছে। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, মানুষের ভোটের অধিকারের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করেছে, তাদের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে।”
তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি কখনো সফল হতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।
বাজেট নিয়ে সমালোচনাকারীদের কড়া জবাব: নতুন অর্থবছরের বাজেট নিয়ে সমালোচনাকারীদেরও কঠোর ভাষায় জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “এই বাজেটে চার কোটি পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, প্রায় তিন কোটি কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, কৃষি খাতে প্রণোদনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর কর কমানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারপরও কেউ কেউ এটিকে জনবিরোধী বাজেট বলে। যারা জনগণের কল্যাণের বাজেটকে জনবিরোধী বলে, তারা কখনো জনগণের বন্ধু হতে পারে না।”
তার ভাষায়, “জনবান্ধব বাজেটকে ব্যঙ্গ করা মানে মানুষের উন্নয়নকে ব্যঙ্গ করা।”
‘জনগণের টাকা আর বিদেশে পাচার হবে না’: অর্থ পাচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই অর্থ দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হওয়ার কথা ছিল।
তিনি বলেন, “জনগণের অর্থ জনগণকে না দিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছিল। এখন থেকে জনগণের টাকা জনগণের জন্যই ব্যয় হবে। দেশের সম্পদ দেশের মধ্যেই থাকবে। যারা অর্থ পাচারের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
‘দেশ গড়ার সময় এখন’: সরকারপ্রধান বলেন, আগামী সময় হবে কাজের সময়, উন্নয়নের সময় এবং দেশ পুনর্গঠনের সময়।
“দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত যদি কাজে লাগে, তাহলে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে কেউ বাধা দিতে পারবে না। জনগণই দেশ স্বাধীন করেছে, জনগণই দেশ গড়বে।”
তিনি বলেন, রাজনীতি হবে মানুষকে কেন্দ্র করে, উন্নয়নকে কেন্দ্র করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে কেন্দ্র করে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বিস্তার: প্রধানমন্ত্রী জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে দেশের নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের সব চা শ্রমিক পরিবারের নারী সদস্যদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড কর্মসূচিও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
“আগামী এক বছরে প্রায় ৪০ লাখ কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। কৃষি, শ্রম ও উৎপাদন খাতকে আরও শক্তিশালী করা হবে,” বলেন তিনি।
নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়: নারী উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নারীদের স্বাবলম্বী না করতে পারলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই নারী শ্রমিক, প্রান্তিক নারী এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।”
তিনি জানান, চা শ্রমিকদের আবাসন উন্নয়নে অনুদান, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি এবং অসহায় ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
প্যান্ডেল ধস, অল্পের জন্য রক্ষা: এর আগে শ্রীমঙ্গলের ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। তবে তিনি পৌঁছানোর আগেই প্রবল বাতাসে অনুষ্ঠানস্থলের একটি প্যান্ডেল ধসে পড়ে। এতে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও সাময়িক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পরে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্বোধন: দিনের কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারে ফ্যামিলি কার্ড পাইলট কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি উপকারভোগী নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন এবং চা শ্রমিক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ও দুস্থ মানুষের জন্য বিভিন্ন আর্থিক সহায়তা ও অনুদান বিতরণ করেন।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/১৭/৬/২০২৬