এস এ খান শিল্টু, মেহেরপুর: মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খান। মেহেরপুর জেলা জামায়াতের আমিরের দায়িত্বও পালন করছেন।
সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তিনি এখনো খাতা-কলমে কর্মরত রয়েছেন মুজিবনগরের মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী পদে।
সংসদ সদস্য হওয়ার পরে মাদ্রাসা থেকেও নিচ্ছেন বেতন-ভাতা। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মাদ্রাসা থেকে অবৈতনিক ছুটি নেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি ছুটি নেননি; মাদ্রাসায় অনুপস্থিত থেকেও মাসের পর মাস বেতন ও ভাতা নিচ্ছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ চলছে শিক্ষক ও কমিটির সদস্যদের মাঝে।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সহকারী মৌলভী বর্তমান সংসদ সদস্য তাজ উদ্দিন খান মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের আংশিক বেতন, মার্চ ও এপ্রিল মাসের পুরো বেতন নিয়েছেন। এর সাথে পেয়েছেন মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরের বোনাস এবং এপ্রিলে পেয়েছেন বৈশাখী ভাতা।
মাদ্রাসার হাজিরা খাতা দেখে জানা গেছে, তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে মাদ্রাসায় অনুপস্থিত রয়েছেন। বেতন শিটে প্রত্যেক শিক্ষক ও কর্মচারীর স্বাক্ষর করতে হলেও তাঁর স্বাক্ষর তাঁর অনুপস্থিতেই কেউ করে দিচ্ছেন। এ নিয়ে মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতিও।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা (২০২৫ ) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী যদি অন্য কোনো লাভজনক পদে বা পূর্ণকালীন চাকরিতে নিয়োজিত হন, তবে তার এমপিও সুবিধা স্থগিত বা বাতিল হয়ে যায়। সংসদ সদস্য পদটি একটি পূর্ণকালীন ও লাভজনক পদ হিসেবে গণ্য হয়। তাই নির্বাচিত হওয়ার পর শিক্ষকতা পেশায় সক্রিয় থেকে বেতন নেওয়া আইনের ব্যত্যয়।
একই নীতিমালার ৪.২৪ (২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক ৬০ দিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার এমপিও স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যাবে।
নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, যদি কোনো শিক্ষক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তবে তাকে সাধারণত তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে লিয়েন বা অবৈতনিক ছুটি নিতে হয়। এই সময়ে তিনি শিক্ষক হিসেবে কোনো বেতন-ভাতা পাবেন না, তবে তার চাকরির সিনিয়রিটি বা পদ বহাল থাকতে পারে।
জানা গেছে, নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে তাজ উদ্দিন খান রাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট বেতন, নির্বাচনি এলাকা ভাতা, আবাসন সুবিধা, চিকিৎসা ভাতা এবং অন্যান্য সংসদীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এই সুবিধাগুলো শিক্ষক হিসেবে প্রাপ্য ভাতার চেয়ে অনেক বেশি বা লাভজনক।
মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানান, ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে তাজ উদ্দিন খান ঠিকমত মাদ্রাসায় হাজিরা দেন না। মাঝে মধ্যে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে যেতেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুরু হলে তিনি তখন একজন প্যারা শিক্ষক নিয়োগ দেন। কিন্তু তিনি ছুটি না নিয়ে বেতন তুলছেন। চলতি মে মাস থেকে সেই প্যারা শিক্ষকও আর আসেন না। ফলে তাঁর ক্লাসগুলো অন্যান্য শিক্ষকদের অতিরিক্ত নিতে হচ্ছে। তিনি এমপি নির্বাচিত হওয়ায় কেউ তাকে নিয়ে কথা বলতে পারেন না। কিন্তু মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাঁকে বেতন-ভাতা দিয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মাদ্রসার অধ্যক্ষ আসাদুল্লাহ আল গালিব বলেন, ‘এ মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী তাজ উদ্দিন খান এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে কয়েকবার বলেছি ছুটি নিতে অথবা শিক্ষা অধিপ্তর থেকে তাঁর পক্ষে কোনো নির্দেশনা নিয়ে আসতে। তারপরও তিনি ছুটি নেননি। তিনি না আসলেও তাঁর বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে।’
তাজ উদ্দিন খানের পরিবর্তে যদি অন্য কোনো শিক্ষক এমন করতেন তবে কি করতেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এর বেশি কিছু বলতে পারবো না।’
মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আহমদ আলী বলেন, ‘এমপি তাজউদ্দিন খানের বিষয়ে আমি গত মিটিংয়ে প্রিন্সিপালকে বলেছি, একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকবেন আর আমি বেতন শিটে সই করবো তা হবে না। সরকারি টাকা এভাবে নষ্ট করলে কৈফিয়ত দেবে কে?’
‘আমি এপ্রিল মাসেও সই করেছি, কিন্তু মে মাসের বেতনে সই করবো না বলে জানিয়ে দিয়েছি।’
এ বিষয়ে মুজিবনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো: মামুন উদ্দিন আল আজাদ বলেন, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক সরকারের দুই কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে পারবেন না। মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী তাজ উদ্দিন খান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, আমি অধ্যক্ষকে বলেছি-আপনি এ বিষয়ে মাদ্রাসা বোর্ডের মহাপরিচালক, এমনকি শিক্ষা সচিব মহোদয়ের কাছে থেকে মতামত নিয়ে তাঁর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন।’
তবে এ বিষয়ে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসার সহকারী মৌলভী তাজ উদ্দিন খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “নির্বাচনের পরপরই রোজার ছুটিতে মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেলো, তারপরপরই আবার সংসদ অধিবেশন শুরু হয়ে গেলো। যে কারণে মাদ্রাসা কমিটির সাথে আমার বসার সুযোগ হয়নি। আমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের বলেছি-আমার বেতন চালু থাক। আমি বেতন তুলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে দেবো, যার স্লিপ মাদ্রাসায় থাকবে।”
তিনি আরো বলেন, ‘বেতন বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় বেতন চালু করা কষ্ট হয়ে যায়, এ জন্য এ কথা বলেছি।’ গত তিন মাসের বেতনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অধিদপ্তর যদি বলে উত্তোলনকৃত টাকা জমা দিতে হবে, আমি জমা দিয়ে দেবো; এবং যদি অবৈতনিক ছুটি নেওয়ার বিধান থাকে তবে অধিদপ্তরের সাথে আলাপ করে প্রয়োজনে ছুটি নেবো।’
উল্লেখ্য, মুজিবনগরের কেদারগঞ্জ বাজারে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মানিকনগর ডিএস আমিনিয়া আলিম মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটিতে ২৯ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৩০ জন। ২০২৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় ২৭ জন অংশ নিয়ে পাশ করেছেন ১৩ জন, কেউ জিপিএ ৫ পাননি।
সানা/আপ্র/১১/৫/২০২৬