গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহত মা, তিন সন্তান ও ভাইকে নিজ গ্রাম গোপালগঞ্জে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। রোববার (১০ মে) বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলার পাইককান্দি মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে উত্তর চরপাড়া নতুন কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শোকাবহ পরিবেশে দাফন সম্পন্ন: রোববার ভোরে লাশবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স পাইককান্দি ইউনিয়নের উত্তর চরপাড়া গ্রামে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারি আর এলাকাবাসীর কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বাড়ির পাশেই অস্থায়ীভাবে লাশের গোসলের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে নতুন কবরস্থানে পাশাপাশি পাঁচটি কবর খুঁড়ে দাফন করা হয়।
শনিবার রাতে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় মরদেহগুলো গোপালগঞ্জে আনা হয়। শেষবারের মতো প্রিয়জনদের দেখতে শত শত মানুষ ভিড় করেন।
নৃশংস হত্যাকাণ্ডের চিত্র: শনিবার সকালে কাপাসিয়ার একটি বহুতল ভবনের নিচতলার ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতরা হলেন-শারমিন আক্তার (৩০), তাঁর তিন সন্তান মীম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮) ও ফারিয়া (২), এবং তাঁর ভাই রসুল মিয়া (২২)। ঘরের ভেতরে রক্তাক্ত অবস্থায় মরদেহগুলো ছড়িয়ে ছিল।
পুলিশ জানায়, শারমিনকে হাত-পা বেঁধে জানালার গ্রিলের সঙ্গে আটকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাশের কক্ষে পড়ে ছিল তিন শিশুর গলাকাটা নিথর দেহ। শ্যালক রসুল মিয়ার মরদেহ বিছানায় কম্বল দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পাওয়া যায়, যার শরীরেও ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।
পরিকল্পিত হত্যার আলামত: ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে মদের বোতল, রান্না করা সেমাই, কোমল পানীয় এবং মাদকসেবনের সরঞ্জাম। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে সবাইকে অচেতন করার পর পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
পুলিশ আরো জানিয়েছে, ঘরের ভেতর থেকে কিছু লিখিত অভিযোগপত্র ও একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে, যাতে পারিবারিক বিরোধ, আর্থিক লেনদেন ও পরকীয়ার অভিযোগের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।
কলহ, সন্দেহ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন: স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোরকান মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহপ্রবণ ছিলেন এবং দাম্পত্য জীবনে অশান্তি বিরাজ করছিল। প্রায় ১৬ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর ঢাকায় বসবাস করলেও চলতি বছরের শুরুতে তারা কাপাসিয়ায় বসবাস শুরু করেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ফোরকান দ্বিতীয় বিয়ের পরিকল্পনা করছিলেন এবং এ নিয়ে দাম্পত্য কলহ তীব্র আকার ধারণ করে। শারমিন স্বামীর আচরণে কষ্ট পেলেও সন্তানদের কথা ভেবে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন।
অন্যদিকে, ফোরকানের রেখে যাওয়া অভিযোগপত্রে স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়া ও শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে, যা নিহতের পরিবার সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।
ঘটনার আগের দিন ও শেষ মুহূর্ত: নিহতের বাবা জানান, ঘটনার আগের দিন রাত প্রায় ৯টার দিকে শারমিন ফোন করে জানান, তারা শিগগিরই বাসা ছেড়ে চলে আসবেন। কিন্তু পরদিন সকালে ফোরকানের ভাইয়ের ফোন পেয়ে দ্রুত খোঁজ নিতে বলা হলে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পান, সবাই নিহত হয়েছেন।
স্বজনদের দাবি, ফোরকান ঘটনার পর নিজেই ফোন করে হত্যার কথা স্বীকার করেন। এরপর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন।
মামলা ও তদন্ত অগ্রগতি: ঘটনার পর নিহত শারমিনের বাবা বাদী হয়ে কাপাসিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ফোরকানকে প্রধান আসামি করে অজ্ঞাত আরো চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে।
পুলিশের অতিরিক্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারিবারিক কলহ ও প্রতিহিংসা থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটির পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে এবং অভিযুক্তকে গ্রেফতারে একাধিক ইউনিট কাজ করছে।
শোক, ক্ষোভ ও বিচার দাবি: এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা ভেঙে পড়েছেন। তাদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দারাও স্তম্ভিত। নিষ্পাপ শিশুদের এমন নির্মম পরিণতি সবাইকে নাড়া দিয়েছে। স্বজনরা দ্রুত বিচার ও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত সকলের বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আগের রাতে সন্তানদের নিয়ে পাশের দোকানে গিয়ে চিপস ও চকলেট কিনেছিলেন ফোরকান: ঘটনার পর থেকেই গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া (৪০) পলাতক রয়েছেন। পুলিশ এখনো তাঁকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতেই ফোরকান তাঁর সন্তানদের নিয়ে পাশের একটি দোকানে গিয়ে চিপস ও চকলেট কিনেছিলেন। দোকানি আবদুর রশিদ জানান, শুক্রবার রাত আটটার দিকে ছোট মেয়ে ফারিয়াকে কোলে নিয়ে এবং আরেক মেয়ের হাত ধরে দোকানে আসেন ফোরকান। সেখানে তিনি শিশুদের জন্য চকলেট ও চিপস কেনেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর শনিবার ভোরে একই বাড়ি থেকে গৃহবধূ শারমিন আক্তার (৩০), তাঁর তিন মেয়ে মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) এবং শ্যালক রসুল মিয়া (২২)–এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাড়ির ভেতরে নারকীয় দৃশ্য পাওয়া যায়। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, শারমিনকে হাত বেঁধে, মুখে টেপ ও কাপড় প্যাঁচানো অবস্থায় পাওয়া যায় এবং ঘরের দেয়ালে রক্তের দাগ ছিল।
ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া পলাতক রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পারিবারিক বিরোধ ও দ্বিতীয় বিয়ের বিষয় নিয়ে দাম্পত্য কলহ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। নিহত শারমিনের পরিবারের দাবি, ফোরকান দ্বিতীয় বিয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং এ নিয়ে দাম্পত্য কলহ তীব্র ছিল। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে একটি অভিযোগপত্রের মতো কাগজ পাওয়া গেছে। তবে এতে কোনো স্বাক্ষর নেই। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কাপাসিয়া থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সানা/আপ্র/১০/৫/২০২৬