অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলসহ ১০ উপজেলায় ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষকের প্রায় ৩১৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তথ্যে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কলমাকান্দা, খালিয়াজুরি ও মদন উপজেলায়। এছাড়া সদর, বারহাট্টা, কেন্দুয়া, আটপাড়া, মোহনগঞ্জ, পূর্বধলা ও দুর্গাপুরেও হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এ বছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৮ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যার ওপর প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নির্ভরশীল। এসব জমি থেকে বছরে প্রায় তিন লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়, যা হাওর এলাকার কৃষকদের জীবিকা ও পারিবারিক ব্যয়ের প্রধান উৎস। তবে এবার অতিবৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বাড়লেও কোনো বাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটেনি; মূলত বৃষ্টির পানিতেই জমি ডুবে গেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এ বছর এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে, যার লক্ষ্যমাত্রা ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন উৎপাদন। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে। সরকারি হিসাবে ৬২ শতাংশ ধান কাটা হলেও বাস্তবে এখনও প্রায় ৬০ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে বলে কৃষকদের দাবি।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা বৃষ্টির কারণে হাওরে পানি জমে থাকায় ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার হেক্টর জমির ধান এখনো পানির নিচে রয়েছে। ডিজেল সংকটের কারণে হারভেস্টার ব্যবহারেও সমস্যা হচ্ছে, আবার জমিতে পানি থাকায় যন্ত্র দিয়েও ধান কাটা যাচ্ছে না।
কৃষকদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধ, পলি জমে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অধিকাংশ স্লুইসগেট অকেজো থাকায় পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে ফসলের ক্ষতি বাড়ছে।
খালিয়াজুরি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপজেলায় প্রায় অর্ধেক ধান কাটা সম্ভব হলেও বাকি প্রায় সব ক্ষেতই পানির নিচে চলে গেছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, কংস ও উব্দাখালি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে এবং ধনু নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
হাওরের এই ফসলহানি কৃষকদের জীবনে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, কারণ এ ফসলের ওপরই তাদের সারা বছরের জীবিকা নির্ভরশীল।
সানা/আপ্র/৪/৫/২০২৬