দেশজুড়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে গত দেড় মাস ধরে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন নিত্যনৈমিত্তক দৃশ্য। এক লিটার তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। ভোক্তাদের মাঝে চলছে নীরব হাহাকার। এরই মধ্যে অনেকটা আকস্মিকভাবেই সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য ২০ শতাংশের বেশি বাড়িয়েছে সরকার।
গত শনিবার (১৮ এপ্রিল) ঘোষিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী লিটারপ্রতি অকটেন ১২০ থেকে ১৪০, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ ও ডিজেল ১০০ থেকে ১১৫ টাকা—যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি বলে জানা গেছে। এমনিতেই নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া। নতুন করে আবার জ্বালানি তেলের এমন উল্লম্ফন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বলে মনে করেন রাজনীতিবিদরা।
এরই মধ্যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল রাজপথে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। অনেকে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, জ্বালানি নিয়ে বৈশ্বিক সংকট আছে। এ বিষয়টি অস্বীকারের সুযোগ নেই। তাই সরকার এ খাতে কিছুটা ভর্তুকি দিয়ে আসছিল। আমি মনে করি বৈশ্বিক ক্রাইসিস ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত আরও কিছু দিন ভর্তুকি দেওয়া যেতো। কিন্তু একলাফে অনেকখানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন দুর্যোগ সৃষ্টি হতে পারে। এটি ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়ার মতো অবস্থা। ধাপে ধাপেও বাড়ানো যেতো। এ মুহূর্তে সংকট মোকাবিলায় সরকার অন্য খাতের আয়ের উদ্ধৃত অংশ জ্বালানি খাতে ব্যয় করতে পারে। তাছাড়া সামগ্রিক নীতি কৌশলও অবলম্বন করা জরুরি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকার জনগণের সঙ্গে নাটক মঞ্চস্থ করে তেলের দাম বাড়িয়েছে। সব ক্ষেত্রেই তারা এমনটি করছে। এটি সেই নাটকের কততম পর্ব সেটিই দেখার বিষয়। সরকার স্বল্প সময়েই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যদিও এখনই এমন মন্তব্য করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। সরকারের মন্ত্রীরা একবার বলছেন দেশে জ্বালানি সংকট নেই, অপরদিকে দেখা যাচ্ছে পাম্পের সামনে যানবাহনের লম্বা লাইন। তাদের বক্তব্য দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়। মূলত দলীয় সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতেই এ সময়ে অবিশ্বাস্য হারে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। তাদের নেতাদের গোয়ালঘরেও তেলের অবৈধ মজুত পাওয়া গেছে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, এমনিতেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। আশা করি জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সরকার জ্বালানি মূল্য সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসবে। অন্যথায় জনগণ রাজপথেই এর জবাব দেবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন মনে করেন, বৈশ্বিক মুক্তবাজার অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় সরকার চাইলে আরও আগেই জ্বালানির দাম বাড়াতে পারতো। যখন বিশ্ববাজারে দাম বাড়তির দিকে ছিল, তখন বলা হলো পর্যাপ্ত তেল মজুত আছে। তাই দেশের মানুষের কষ্ট বিবেচনা করে দাম বাড়ানো হবে না। বারবার সংকট না থাকার কথা বললেন সরকারের দায়িত্বশীলরা। আবার দাম বাড়ানোরও ইঙ্গিত দিলেন কেউ কেউ। এতে মজুতদাররা সুযোগ পেলো। শেষ পর্যন্ত কারও সঙ্গে পরামর্শ না করে অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে দুর্ভোগ বাড়লো সাধারণ মানুষের আর সুবিধা হলো মজুতদারদের। সরকারের সমন্বয়হীনতা ও ব্যর্থতার কারণেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বলেন, হঠাৎ করে জ্বালানির দাম যে হারে বেড়েছে, তা অস্বাভাবিক। এর মাধ্যমে পরিবহন ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যয় বাড়বে। মারাত্মক চাপে পড়বে সাধারণ জনগণ। এতদিন সরকার বলছে দেশে জ্বালানি সংকট নেই। অথচ সারা দেশের পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন। সরকারের এ ধরনের লুকোচুরি গ্রহণযোগ্য নয়।
চলমান সংকট সরকার কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা পরিষ্কার করতে হবে। জনগণসহ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হবো।
চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, সরকার বৈশ্বিক পরিস্থিতির অজুহাতে হঠাৎ জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশে বেড়েছে কিনা, তা দেখতে হবে। যখন দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, আমরা তখনই এ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছি। এমনিতেই দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষের অবস্থা শোচনীয়। মানুষের কাজের ক্ষেত্র ও আয় সীমিত হয়ে পরেছে। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ অন্য পণ্যের ওপর পড়বে। বেড়ে যাবে পরিবহন ব্যয়।
তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে আসবে। বিপুল জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক চাপ ফেলে সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন ব্যয় করছে। অথচ তারা চলছে ব্যাংক ঋণের ওপর। আমরা মনে করি, এ ধরনের প্রকল্প এক ধরনের বিলাসিতা। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে আমরা দলীয় বৈঠকের পর কর্মসূচি ঘোষণা করবো।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, পরিবহন ও কলকারখানাসহ তেল মানুষের জীবনে বহুমুখী প্রভাব রাখে। বিশ্বজুড়ে যখন দাম বাড়ানো হয়েছে, তখন থেকে ধাপে ধাপে বাড়ানো উচিত ছিল। এখন যখন কমলো, তখন আবার দেশে বাড়ানো হলো। এতে সুযোগ পেলো দুষ্ট চক্র। আর যে হারে ব্ড়ানো হলো, তা অস্বাভাবিক। এমনিতেই মানুষ আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে পারছে না। এমন সিদ্ধান্ত আরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সরকারের উচিত এ নিয়ে সবার মতামত নিয়ে কৌশল নির্ধারণ করা। অন্যথায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সানা/আপ্র/১৯/৪/২০২৬