মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দেওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গণপরিবহনের চাকা কার্যত থমকে যেতে শুরু করেছে। পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় অনেক বাসই রাস্তায় নামতে পারছে না, ফলে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা।
রাজধানীর আজিমপুর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা রুটে চলাচলকারী ‘ভিআইপি’ বাসের চালক মোহাম্মদ মামুন জানান, গত তিন দিন ধরে তিনি বাস চালাতে পারছেন না। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে তাঁর দৈনন্দিন আয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আয় বন্ধ থাকলেও খরচ থেমে নেই। বাসা ভাড়া, বাজার-সদাই, সন্তানের পড়াশোনা-সবকিছু চালাতে হচ্ছে। এখন অবস্থা এমন যে, দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।”
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একাধিক ‘ভিআইপি’ বাস সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কোনো পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, জ্বালানি না থাকায় চালক ও সহকারীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। অনেকেই জানাচ্ছেন, রাত থেকেই তারা সিরিয়ালে থেকেও তেল পাচ্ছেন না।
চালকদের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় পাম্পে ঘুরেও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সীমিত সরবরাহ থাকায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় ফিরে যেতে হচ্ছে।
নীলক্ষেতের একটি পাম্পে অপেক্ষমাণ চালক সেলিম মিয়া বলেন, “গত রাত থেকেই লাইনে আছি। এক ট্রিপ দেওয়ার পর তেল শেষ হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় ঘুরেও পাইনি।”
জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু বাস নয়, মাইক্রোবাস, কাভার্ড ভ্যান, প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে নগরজীবনে বাড়ছে ভোগান্তি ও সময়ক্ষেপণ।
পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, আয় বন্ধ হলেও তাদের ব্যয় থেমে নেই। এতে পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না করা গেলে এই সংকট আরো তীব্র হয়ে রাজধানীর জনজীবনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তেলের লাইনে ২২ ঘণ্টা: দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল পেরিয়ে রাত, আবার ভোর-শেষে এসে আরেকটি দুপুর। এই দীর্ঘ ২২ ঘণ্টা ধরে রাজধানীর আসাদ গেট এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন ৬৩ বছর বয়সী গাড়িচালক শঙ্কর চন্দ্র দাস।
গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুর ২টার দিকে তিনি মেসার্স তালুকদার ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়ান। তখন তাঁর সামনে ছিল অন্তত ৫০০টি গাড়ি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে যখন তিনি পাম্পের খুব কাছাকাছি পৌঁছান, তখন জানানো হয়-তেল শেষ। এরপর থেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা চলছে নতুন সরবরাহের।
শঙ্কর চন্দ্র দাস জানান, তেল পাওয়ার আশায় তিনি আর বাসায় ফেরেননি। গাড়িতেই রাত কাটাতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “লাইনে থাকতে থাকতে খাবারের পেছনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। মালিক কয়েকবার ফোন করেছেন, কিন্তু আমি তেল না নিয়ে যেতে পারিনি।”
ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার মো. এরশাদ জানান, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ অকটেন সরবরাহ করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। গতকাল বিকেল ৫টায় তেল এলেও রাতের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। পরবর্তী সরবরাহ আবারো বিকেলে আসার কথা রয়েছে।
একই চিত্র দেখা গেছে একই এলাকার আরো কয়েকটি ফিলিং স্টেশনেও। কোথাও গাড়ির লাইন আসাদ গেট থেকে সংসদ ভবনের পেছন ঘুরে বিজয় সরণি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, কোথাও আবার শত শত মোটরসাইকেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।
সায়েম আহমেদ নামে এক মোটরসাইকেল চালক জানান, তিনি একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাননি। “গতকাল রাতেও তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে গেছি। আজ আবার এসেছি,” বলেন তিনি।
দীর্ঘ অপেক্ষা, তীব্র রোদ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালকদের মধ্যে দেখা গেছে চরম ক্লান্তি ও হতাশা। অনেকেই সড়কের পাশে বা ফুটপাতে বসে অপেক্ষা করছেন পরবর্তী তেল সরবরাহের আশায়।
সানা/আপ্র/১০/৪/২০২৬