রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
নিহতদের মধ্যে ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৭ জন পুরুষ রয়েছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাপস কুমার পাল।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। গত বুধবার বিকাল সোয়া ৫টার দিকে পন্টুন থেকে বাসটি নদীতে পড়ে তলিয়ে যায়।
বাসটি দৌলতদিয়া ঘাট হয়ে ঢাকায় ফিরছিল। কুষ্টিয়া থেকে ছয়জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাসটি পথে আরও যাত্রী তোলায় এতে ৪০ জনের বেশি লোকজন থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও ভিডিওতে দেখা যায়, ঘাটের ৩ নম্বর পন্টুনে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিল বাসটি। হঠাৎ এটি চলতে শুরু করে। চালক তখন আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। এটি পন্টুন পেরিয়ে উল্টে পদ্মায় পড়ে; সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যায় নদীতে।
ডুবন্ত বাসটি থেকে কয়েকজন সাঁতরে বের হতে পারলেও বেশির ভাগ যাত্রী আটকা পড়ে যান।
বাসটি নদীর ৭০ থেকে ৮০ ফুট গভীরে তলিয়ে গিয়েছিল জানান ফায়ার সার্ভিসের ফরিদপুর স্টেশনের সহকারী পরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন।
উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র চেষ্টায় বুধবার রাত সোয়া ১১টার দিকে বাসটির সামনে অংশ নদীর উপরে উঠে আসে। নদীর গভীর থেকে বাসটি টেনে তুলতে শুরু করলে একে একে লাশের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
রাতেই একে একে ২৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে বৃহস্পতিবার উদ্ধারকারী দলের তৎপরতায় উদ্ধার করা হয় আরও তিনজনের মরদেহ।
এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল ও দুর্ঘটনাস্থল।
প্রাণ গেল যাদের
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৭ জন পুরুষ রয়েছে বলে জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাপস কুমার পাল।
নিহতরা হলেন- ১) রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর গ্রামের লালমিয়া সড়কের মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১),
২) রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দার মৃত ডা. আবদুল আলীমের ছেলে জহুরা অন্তি (২৭),
৩) রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দার কাজী মুকুলের ছেলে কাজী সাইফ (৩০),
৪) রাজবাড়ী পৌরসভার সজ্জনকান্দার কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭),
৫) রাজবাড়ী পৌরসভার সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১),
৬) রাজবাড়ী সদরের মিজানপুরের রামচন্দ্রপুরের গ্রামের সোবাহান মন্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬),
৭) রাজবাড়ী সদরের মিজানপুরের বড় চর বেনিনগর গ্রামের মান্নান মণ্ডলের স্ত্রী জোস্ন্যা (৩৫),
৮) রাজবাড়ী সদরের দাদশি আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮),
৯) রাজবাড়ী সদরের ভবানীপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন খানের ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫),
১০) গোয়ালন্দের ছোট ভাকলার চর বারকিপাড়া গ্রামের রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২),
১১) গোয়ালন্দের ছোট ভাকলার চর বারকিপাড়া গ্রামের রেজাউল করিমের মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২),
১২) কালুখালীর মহেন্দ্রপুর বেলগাছি গ্রামের আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০),
১৩) কালুখালীর মহেন্দ্রপুর বেলগাছি গ্রামের আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুর রহমান (৬),
১৪) কালুখালীর বোয়ালিয়ার ভবানীপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের মেয়ে ফাইজ শাহানূর (১১),
১৫) কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের মজমপুর গ্রামের মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬),
১৬) কুষ্টিয়া সদরের খাগড়বাড়ীয়া গ্রামের হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮),
১৭) কুষ্টিয়ার খোকসার সমাজপুর ধুশুন্দু গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩),
১৮) কুষ্টিয়ার খোকসার সমসপুরের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩),
১৯) গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার, আমতলীর নোয়াধা গ্রামের মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮),
২০) দিনাজপুর পার্বতীপুর পলাশবাড়ীর মথুয়ারাই গ্রামের মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০),
২১) ঢাকা আশুলিয়ার বাগধুনিয়া পালপাড়া গ্রামের নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০),
২২) ঝিনাইদহের শৈলকুপার কাচেরকোলের খন্দকবাড়িয়া গ্রামের নুরুজ্জামানের ছেলে আরমান (৭ মাস),
২৩) বাস চালক বালিয়াকান্দির পশ্চিম খালখোলা গ্রামের আরব খানের ছেলে আরমান খান (৩১)।
এছাড়া বৃহস্পতিবার উদ্ধারকারী দলের তৎপরতায় উদ্ধার করা হয় আরও তিনজনের মরদেহ।
তারা হলেন, জাহাঙ্গীর হোসেন (৫৫), আশরাফুল (৩০) এবং ফল ব্যবসায়ী উজ্জ্বল হোসেন। এ তিনজনই রাজবাড়ীর কালুখালি উপজেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল থেকে ১৪ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আরও ৫টি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দুটি মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। নিখোঁজদের খোঁজে এখনও অনেক পরিবার ছুটে বেড়াচ্ছে।
সানা/আপ্র/২৬/৩/২০২৬