পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) থেকে। টানা ছুটির সুযোগে নাড়ির টানে রাজধানীসহ বড় শহরগুলো ছাড়তে শুরু করেছেন লাখো মানুষ।
সরকার ১৮ মার্চও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় কর্মজীবী মানুষেরা বাড়তি স্বস্তিতে বাড়ি ফিরছেন। সোমবার ছিল ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস। সকাল থেকেই রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে। তবে অফিস-আদালত বন্ধ হওয়ায় নগরীর সড়কগুলো অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়েছে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২০ অথবা ২১ মার্চ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সায়েদাবাদে যাত্রীর চাপ ও ভোগান্তি: রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে সকাল থেকেই ঘরমুখো মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপ আরো তীব্র হয়।
যাত্রীদের অভিযোগ-নির্ধারিত সময়ে বাস ছাড়ছে না; ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে; অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে; আসনের চেয়ে বেশি যাত্রী নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে
কুমিল্লাগামী এক যাত্রী মাহিবুর রহমান বলেন, বেশি ভাড়া হলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়ি যেতেই হবে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, যানজটের কারণে বাস সময়মতো টার্মিনালে পৌঁছাতে না পারায় এই বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে দিনের প্রথম ভাগে কিছু রুটে যাত্রীর চাপ তুলনামূলক কম থাকলেও ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গাবতলীতে উল্টো চিত্র: যাত্রী কম, হাঁকডাক শ্রমিকদের: গাবতলী বাস টার্মিনালে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। চাহিদা অনুযায়ী যাত্রী না থাকায় পরিবহন শ্রমিকদের কাউন্টারে হাঁকডাক দিয়ে যাত্রী খুঁজতে দেখা গেছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে- অনেক যাত্রী ট্রেন ও পদ্মা সেতুপথে যাতায়াত করছেন; বিকল্প রুট বাড়ায় এই টার্মিনালে যাত্রী কমেছে।
যদিও কিছু যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। আবার কিছু পরিবহন কম ভাড়ায় টিকিট বিক্রির কথাও জানিয়েছে।
মহাসড়কে চাপ বাড়লেও বড় যানজট নেই: ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক: ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে। তবে যানবাহনের চাপ থাকলেও কোথাও বড় ধরনের যানজট দেখা যায়নি। গাজীপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেন সুবিধায় যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও এলেঙ্গা থেকে সেতু পর্যন্ত কিছুটা ধীরগতি রয়েছে উন্নয়নকাজের কারণে। সেতুর দুই প্রান্তে বাড়তি টোল বুথ চালু রেখে দ্রুত পারাপার নিশ্চিত করা হচ্ছে। সোমবার ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ হাজার ৬৫৮টি যানবাহন সেতু পার হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক: কুমিল্লা অংশে ধীরগতি: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ধীরগতি ও জটলা থাকলেও বড় যানজট হয়নি। হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি ৮০ জন রোভার স্কাউট সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন যাত্রীদের সহায়তায়।
এখানেও অভিযোগ- বিশেষ করে মাঝপথ থেকে ওঠা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
পদ্মা সেতুতে স্বস্তি, তবু ভাড়ার অভিযোগ: পদ্মা সেতুপথে এবারের ঈদযাত্রা অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। যানবাহনের চাপ থাকলেও কোথাও যানজট নেই। একাধিক টোল বুথ চালু থাকায় দ্রুত পারাপার সম্ভব হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন। তবে এখানেও যাত্রীদের অভিযোগ-
নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে।
নৌপথে স্বাভাবিক চলাচল: পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ও আরিচা-কাজিরহাট নৌপথে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ কিছুটা বাড়লেও ভোগান্তি নেই। ফেরি ও লঞ্চ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করায় যাত্রীরা নির্বিঘ্নে নদী পার হচ্ছেন। ঈদ উপলক্ষে ফেরির সংখ্যা বাড়িয়ে ১৭টি করা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
ট্রেনে ফিরতি যাত্রার টিকিট বিক্রি শুরু: ঈদ শেষে ফিরতি যাত্রার জন্য অগ্রিম টিকিট বিক্রি করছে রেলওয়ে। মঙ্গলবার বিক্রি হয়েছে ২৭ মার্চের টিকিট। শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রি করা হচ্ছে। একজন যাত্রী সর্বোচ্চ চারটি টিকিট কিনতে পারবেন এবং এসব টিকিট ফেরতযোগ্য নয়।
নিরাপত্তা ও তদারকিতে জোর: ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে সড়ক, রেল ও নৌপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে কন্ট্রোল রুম চালু, ভিজিল্যান্স টিম কাজ করছে, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন, যাত্রী হয়রানি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ে নজরদারি।
ভোগান্তি সত্ত্বেও থামেনি ঘরে ফেরার ঢল: কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া, কোথাও ধীরগতি, আবার কোথাও যাত্রী সংকট-বিভিন্ন চিত্রের মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছে এবারের ঈদযাত্রা। তবে সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঘরে ফেরার এই স্রোতে ভাটা নেই। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এখন একটাই দৃশ্য-নাড়ির টানে মানুষের অবিরাম যাত্রা।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৭/৩/২০২৬