বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা ও সামাজিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রে রয়েছে ধর্মীয় সহাবস্থান, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক সুদীর্ঘ ধারা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ ভূখণ্ডে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে এসেছে-কখনো প্রতিবেশী হিসেবে, কখনো সহকর্মী হিসেবে, আবার কখনো একই সামাজিক সংকট ও সম্ভাবনার অংশীদার হয়ে। এই বহুত্ববাদী ঐতিহ্যই বাংলাদেশের শক্তি। তাই রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক উদ্যোগে সম্প্রীতির বার্তা যত দৃঢ় হবে, দেশের ভবিষ্যৎ ততই স্থিতিশীল ও আশাব্যঞ্জক হয়ে উঠবে।
সম্প্রতি বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, সেবায়েত ও বৌদ্ধ বিহারের দায়িত্বশীলদের জন্য সম্মানী প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে ‘শান্তির বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার যে প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্ত করেছেন, তা কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগের ঘোষণা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক দর্শনের প্রতিফলন। ধর্মীয় নেতাদের সম্মাননা প্রদান এবং তাদেরকে সামাজিক উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার এই উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর জীবনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গভীর ও বহুমাত্রিক। মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা বৌদ্ধ বিহার শুধু উপাসনার স্থান নয়; এগুলো সমাজের নৈতিক শিক্ষা, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশেরও কেন্দ্র। এখান থেকেই মানুষ ধৈর্য, সততা, সহিষ্ণুতা, উদারতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা পায়। তাই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা ও ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে তারা আরো সক্রিয়ভাবে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন।
একই সঙ্গে এটি স্মরণ রাখা জরুরি যে, ধর্মীয় সম্প্রীতি কোনো কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়; এটি একটি জীবন্ত সামাজিক অনুশীলন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন সব নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তেমনি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে বিভেদ নয়, বরং সহাবস্থানের সংস্কৃতি শক্তিশালী করা। ধর্মের নামে বিভাজন, বিদ্বেষ বা অসহিষ্ণুতা কখনোই একটি সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। বরং ধর্মের মূল শিক্ষা-মানবকল্যাণ, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতা-এই মূল্যবোধগুলোই সামাজিক জীবনে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা যখন অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশের জন্য তার ঐতিহ্যগত সম্প্রীতির ভিত্তিকে আরো দৃঢ় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামাজিক বাস্তবতা বলে-এই দেশের মানুষ সংকটের সময় ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে জানে। এই মানসিকতাই জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।
ধর্মীয় নেতারা সমাজে নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তাই উপাসনালয়গুলোকে কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক সচেতনতা, মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সহনশীলতা, সংলাপের সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং সমঅধিকারভিত্তিক পরিবেশে বসবাস করতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সেই শক্তির একটি ভিত্তি হলেও নৈতিক মূল্যবোধই সেই শক্তিকে স্থায়ী করে। তাই উন্নয়ন ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল ও সম্প্রীতিময় সমাজ গড়ে তোলাই আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা যেন বিভেদের পথে নয়, বরং ঐক্য ও সহাবস্থানের পথে এগিয়ে যায়-এটাই সময়ের দাবি। ধর্মের ভিন্নতা নয়, মানবিকতার বন্ধনই হোক আমাদের জাতীয় শক্তির মূল ভিত্তি। সম্প্রীতির এই ধারাই এগিয়ে নিক শান্তি, স্থিতি ও অগ্রগতির বাংলাদেশকে।
সানা/আপ্র/১৬/৩/২০২৬