চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতায় ১০ জন নিহত এবং অন্তত ১ হাজার ৯৩৩ জন আহত হয়েছেন। দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দল, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘর্ষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বিরোধকে ঘিরে এসব ঘটনা ঘটে।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে কমপক্ষে ৩৪৬টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১,৯৩৩ জন। জানুয়ারির তুলনায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। জানুয়ারিতে ১৫১টি ঘটনায় ৮ জন নিহত ও ১,২৩৩ জন আহত হয়েছিলেন।
৩৪৬টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৯৫টি ঘটনায় ৫৯৯ জন আহত ও ৮ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ১৯১টি ঘটনায় ৯৯৮ জন আহত ও ১ জন নিহত হন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ৯টি ঘটনায় ২৭ জন আহত ও ১ জন নিহত হন।
বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষে ১৪টি ঘটনায় ১৩৮ জন আহত হন। আওয়ামী লীগ-এনসিপি সংঘর্ষে ৩টি ঘটনায় ৫১ জন এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের সংঘর্ষে ২৮টি ঘটনায় ৮১ জন আহত হন। এছাড়া বিভিন্ন দলের মধ্যে ১১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪২ জন। নিহত ১০ জনের মধ্যে বিএনপির ৮ জন, জামায়াতের ১ জন এবং আওয়ামী লীগের ১ জন রয়েছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনা, সমাবেশকেন্দ্রিক সংঘর্ষ, প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি, এসব কারণে অধিকাংশ সহিংসতা ঘটেছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ৩৪৬টি ঘটনার মধ্যে অন্তত ২৮৫টি ছিল নির্বাচন সংশ্লিষ্ট। এতে ১,৫৫৫ জন আহত ও ৫ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন ও জামায়াতের ১ জন রয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে ৪৫০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনি কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এ মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ৩০টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৪৯৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১৪,৭৮৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। রাজনৈতিক মামলায় আওয়ামী লীগের ৯৮ জন, বিএনপির ১৮১ জন ও জামায়াতের ৫০ জনসহ মোট ৩৩৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে প্রায় ৩ হাজার ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছেন।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ৪২টি ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননা ও আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটে।
এছাড়া ২৮টি হামলায় ৬৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৫ জন আহত, ১ জন লাঞ্ছিত, ৪ জন হুমকির মুখে পড়েন এবং ১ জনকে আটক করা হয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬টি সভা-সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দেয়। এতে ৯২ জনের বেশি ব্যক্তি আহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন ও বন্দুকযুদ্ধে ২ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গুলশান লেকে ঝাঁপ দিয়ে ১ জন এবং নির্বাচনের দিন ধাওয়া খেয়ে আরো ১ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়। কারাগারে সাবেক মন্ত্রীসহ মোট ১২ জন (১০ জন কয়েদি ও ২ জন হাজতি) মারা গেছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ১৪টি হামলায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। হামলা হয়েছে ৩টি মন্দির, ১টি প্রতিমা ও ১১টি বসতবাড়িতে। সীমান্তে সহিংসতায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৯ জন আটক এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২টি ঘটনায় ৫ জন আটক হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। টেকনাফ সীমান্তে গুলিবিদ্ধ এক শিশুর মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
শ্রমিক নির্যাতনের ৩৩টি ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ১২৩ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ২০ শ্রমিক মারা গেছেন। গৃহপরিচালিকা হত্যার ১টি ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে জানানো হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ২৩৬ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৪৫ জন ধর্ষণ, ১০ জন গণধর্ষণ এবং ৩ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত, ২৬ জন আহত ও ৩০ জন আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া ৯৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নির্বাচনি সহিংসতা, মব জাস্টিস, হেফাজতে মৃত্যু ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে।
তিনি সরকারের প্রতি আরো জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান এবং নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
সানা/ডিসি/আপ্র/৩/৩/২০২৬