পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে ওঠা প্রশ্নের সরাসরি জবাব চেয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রতিমন্ত্রীর পাল্টা প্রশ্ন করাকে ‘বার্তাবাহককে আক্রমণ’ বা ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ প্রবণতা হিসেবে আখ্যায়িত করে সংস্থাটি বলেছে, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাক্স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকার খর্ব করার আত্মঘাতী প্রয়াস।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কাউকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া অসাংবিধানিক। তাই দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় হুমায়ুন কবিরের নিয়োগ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সে বিষয়ে তাঁর নিজের অবস্থান স্বচ্ছভাবে জানানো প্রয়োজন। বিষয়টি স্পষ্ট না করেই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
টিআইবি বলেছে, সংবাদটি কে করেছে কিংবা কে প্রশ্ন তুলেছে, সেটি মূল বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন হলো-পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল ছিল কি না। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ও সাংবিধানিক এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া তাঁর দায়িত্ব।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলক পাল্টা প্রশ্ন একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য অনৈতিক ও উদ্বেগজনক। এ ধরনের আচরণ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এবং সংবাদকর্মীদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘চিলিং ইফেক্ট’ সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর মতে, এটি পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ চর্চার প্রতিফলন।
গত শুক্রবার টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন হুমায়ুন কবির। তিনি শৈশব থেকে যুক্তরাজ্যে বেড়ে উঠেছেন এবং দেশটির নাগরিক বলে যুক্তরাজ্য বিএনপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন। তবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, তা তাঁরা নিশ্চিত করতে পারেননি।
এ বিষয়ে সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে প্রতিমন্ত্রী সরাসরি উত্তর না দিয়ে জানতে চান, ‘কে এটা নিউজ করেছে?’ এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কার এত জ্বালা যে কাজ করতে দেবে না?’ একই সঙ্গে ২০০৮ সাল এবং মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সময়ের প্রসঙ্গও তোলেন।
টিআইবি বলেছে, বিষয়টি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদকে কেন্দ্র করে হওয়ায় এর আন্তর্জাতিক মাত্রা রয়েছে এবং বাংলাদেশের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ এবং নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতার বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সমমর্যাদার দায়িত্বশীল ব্যক্তির দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তাঁদের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক জবাবদিহির স্বার্থে প্রামাণ্য তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে সরকারের অবস্থান: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যম অঙ্গনে আলোচনা-বিতর্কের মধ্যে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। মঙ্গলবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংবিধান মেনেই শপথ গ্রহণ করেছেন এবং এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ব্যত্যয় ঘটেনি।
একই সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মন্তব্যকে ‘ক্যাজুয়াল’ ও ‘ইনফরমাল’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি এটিকে খুব বেশি গুরুত্ব না দেওয়ার আহ্বান জানান।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নাগরিকত্ব নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী অনানুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেছেন। এ বিষয়ে জানতে হলে সরাসরি তাঁর সঙ্গেই কথা বলা সবচেয়ে উপযুক্ত হবে।
তিনি আরো বলেন, বক্তব্যটি কীভাবে এসেছে, তার চেয়ে সেটি কীভাবে বলা হয়েছে, সেটিও দেখা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষ্য, প্রতিমন্ত্রী কিছুটা অনানুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে কথা বলছিলেন। বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব না দেওয়াই সমীচীন। তবে প্রয়োজন মনে করলে সরকার পরবর্তীতে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে।
এর আগে সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নাগরিকত্ব নিয়ে পরোক্ষ মন্তব্য করেছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তাঁর ওই মন্তব্যের পরই দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৫/৮/২০২৬