গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

অনামিকায় আংটি পরার রীতিতে লুকানো সাংস্কৃতিক বিবর্তন

লাইফস্টাইল ডেস্ক

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৫২ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:২৯ এএম ২০২৬
অনামিকায় আংটি পরার রীতিতে লুকানো সাংস্কৃতিক বিবর্তন
ছবি

ছবি সংগৃহীত

আজকাল ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের ফিড স্ক্রল করলেই ভেসে ওঠে আবেগঘন ভালোবাসার মুহূর্ত। কোনোটিতে দেখা যায়, নদীর তীরে বা কোনো ছাদের রঙিন আলোকসজ্জায় হাঁটু গেড়ে প্রিয় মানুষটির দিকে আংটি ও একগুচ্ছ তাজা গোলাপ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনোটিতে দেখা যায় একদম সারপ্রাইজ আয়োজনে চোখের জল আর হাসির আবহে আংটি বদল হচ্ছে। এমন ভিডিওগুলোতে হাজার হাজার লাইক আর ভালোবাসার রিয়্যাক্ট মুহূর্তেই স্পষ্ট করে দেয় ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে আংটি বদল বা প্রপোজালের এই দৃশ্যগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেন্ড। তবে এই সুন্দর দৃশ্যের পেছনে জড়িয়ে আছে কত গভীর ইতিহাস আর আবেগ, তা কি আমরা জানি? শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ট্রেন্ডের জন্য নয়, আজকের দিনে আংটি বদল ছাড়া বাগদান বা বিয়ের কথা ভাবাই হয় না। আঙুলে এক টুকরা ধাতব রিং পরিয়ে প্রিয় মানুষকে জীবনসঙ্গী করার এই সংস্কৃতি আমরা খুব সাধারণভাবে গ্রহণ করেছি আমাদের পূর্বসূরিদের থেকে। তবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনামিকায় আংটি পরার এই রীতি আজকের নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বিবর্তন এবং আধুনিক বিপণন কৌশলের এক চমকপ্রদ গল্প।

বাগদান বা বিয়ের আংটি সব সময় বাঁ হাতের চতুর্থ আঙুল বা অনামিকাতে পরানো হয়। প্রাচীন বিশ্বাস ছিল, এই আঙুলের সঙ্গে সরাসরি হৃদয়ের সংযোগকারী একটি শিরা রয়েছে- যাকে লাতিন ভাষায় বলা হতো ভেনাস আমোরিস বা ভালোবাসার শিরা। প্রাচীন মিসরীয়, গ্রিক ও রোমানরা বিশ্বাস করত, ভালোবাসার অনুভূতি সরাসরি হৃদয়ে পৌঁছে দিতে অনামিকাই সবচেয়ে উপযুক্ত। যদিও আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, মানবদেহে এমন বিশেষ কোনো শিরা নেই, তবুও এই রোমান্টিক লোকবিশ্বাসটি আজও আংটি পরার ঐতিহ্য হিসেবে টিকে রয়েছে। বিয়ের আংটির ইতিহাসের একদম গোড়ার দিকে চোখ রাখলে দেখা যায় প্রাচীন মিসরীয়দের অবদান। মিসরীয় ফারাওদের যুগে আংটির বৃত্তাকার রূপকে ধরা হতো অনন্তকালের প্রতীক হিসেবে। এর শুরু বা শেষ নেই। এমনকি তারা উরোবোরোস বা নিজের লেজ নিজে গিলে খাওয়া সাপের প্রতীকের নকশার আংটি পরত। এটি জন্ম-মৃত্যুর চিরন্তন চক্র নির্দেশ করত। পরবর্তী সময়ে গ্রিক ও রোমানরা এই ঐতিহ্য গ্রহণ করে। প্রাচীন রোমে বাগদানের উপহার হিসেবে লোহা দিয়ে তৈরি আংটি দেওয়ার প্রচলন ছিল, যাকে বলা হতো আনুলি প্রোনুবি। এ আংটি কেবল ভালোবাসার প্রতীক ছিল না, বরং দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের চুক্তির প্রতিশ্রুতি বোঝাত। কখনো কখনো আংটিতে চাবির নকশা থাকত। এটি দিয়ে বোঝানো হতো, স্ত্রী এখন থেকে ঘরের সম্পদের দেখভালের দায়িত্ব পেলেন। তৃতীয় শতক নাগাদ রোমান অভিজাতদের মধ্যে সোনা ও রুপার আংটির ব্যবহার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ সময় দুটি হাত মেলানো নকশার ফিদে আংটির প্রচলন ঘটে- যা বন্ধুত্ব ও চুক্তির বার্তা বহন করত।

মধ্যযুগে এসে আংটির নকশায় যুক্ত হয় হীরা, রুবি ও প্যাসন বা স্বর্গীয় অনুভূতির প্রতীক হিসেবে স্যাফায়ার। ষোলো শতকে ইউরোপে গিমেল রিং নামে এক বিশেষ ধরনের আংটি জনপ্রিয় হয়। এতে দুই বা তিনটি ব্যান্ড বা রিং একসঙ্গে যুক্ত থাকত। বাগদানের সময় পাত্র-পাত্রী আলাদা ব্যান্ড পরতেন এবং বিয়ের দিন দুটিকে একত্র করে কনের আঙুলে পরিয়ে দেওয়া হতো। প্রায় কাছাকাছি সময়ে আইরিশদের ক্ল্যাডা আংটির প্রচলন হয়। এই ধরনের আংটিতে দুটি হাত দিয়ে একটি হৃদয় ধরে রাখার নকশা খচিত থাকত। এ ছাড়া আরও একধরনের রিংয়ের প্রচলন ছিল; যাকে বলা হয় পোয়েসি রিং। এর ভেতরের দিকে কবিতা বা প্রেমপত্র খোদাই করা থাকত। আমেরিকার কিউরিটান বা গোঁড়া ধর্মীয় সমাজ অলংকারকে অপচয় মনে করত। তাই সেখানে বর তাঁর হবু স্ত্রীকে একটি থিম্বল বা সেলাইয়ের কাজে আঙুলে পরার বস্তু উপহার দিত। কনে গৃহস্থালির কাজে সেলাই শেষ করার পর থিম্বলের ওপরের অংশ কেটে সেটি আংটি হিসেবে আঙুলে পরত।

হীরার ইতিহাস অনেক পুরোনো হলেও বিয়ের আংটিতে হীরার ব্যবহার শুরু হয় বিশেষ এক ঘটনার মধ্য দিয়ে। ১৪৭৭ সালে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ম্যাক্সিমিলিয়ান তাঁর হবু স্ত্রী মেরি অব বারগান্ডিকে প্রথম হীরাখচিত বাগদানের আংটি উপহার দেন, যা অভিজাত সমাজে বেশ আলোড়ন তোলে। তবে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে হীরার আংটি পৌঁছে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ডি বিয়ার্স নামক এক হীরা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের। ১৯৩০-এর দশকে মন্দার কারণে হীরার বিক্রি কমে গেলে ডি বিয়ার্স এক বিশাল প্রচারণা শুরু করে। ১৯৪৭ সালে তারা নিয়ে আসে বিখ্যাত স্লোগান ‘আ ডায়মন্ড ইজ ফরএভার’। হলিউড তারকাদের সিনেমায় হীরার অলংকার পরিয়ে প্রচার করা হয়, হীরা ভালোবাসার স্থায়ী রূপ এবং একজন পুরুষের উপার্জন সক্ষমতার বড় প্রমাণ। এই প্রচারণার ফলে ১৯৩৯ সালে যেখানে আমেরিকার মাত্র ১০ শতাংশ কনে হীরার আংটি পেতেন, ১৯৯০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ শতাংশে।

এক সময় আংটি পরার রীতির সিংহভাগই ছিল নারীদের জন্য। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধে যাওয়া আমেরিকান ও ইউরোপীয় সেনারা পরিবার ও প্রিয়তমার স্মৃতি ধরে রাখতে আংটি পরা শুরু করেন। এর পর থেকে পুরুষদের মধ্যেও বিয়ের আংটি পরার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে বিয়ের আংটি কেবল একটি অলংকার নয়, এটি নিজস্ব ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম। ইকো-ফ্রেন্ডলি বা পরিবেশবান্ধব ল্যাবে তৈরি হীরা, ভিনটেজ কাট কিংবা নীল-সবুজ রত্নখচিত কাস্টমাইজড আংটি এখন অনেকের পছন্দ। আজকের দিনে আংটির নকশা বা উপাদানে হাজারো পরিবর্তন এলেও এর পেছনের মূল সুরটি কিন্তু একই রয়েছে। শতকের পর শতক ধরে ধাতুর তৈরি এই ছোট গোল বৃত্তটি দুজন মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আজীবন একসঙ্গে থাকার এক নীরব চুক্তি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। সূত্র: ব্রাইডস।

কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

মানুষের বিবেকহীন স্বার্থ, অসচেতনতা ও নিষ্ঠুরতায় বিপন্ন হচ্ছে প্রাণিকুল
০৫ অক্টোবর ২০২৬

মানুষের বিবেকহীন স্বার্থ, অসচেতনতা ও নিষ্ঠুরতায় বিপন্ন হচ্ছে প্রাণিকুল

পৃথিবী শুধু মানুষের বসবাসের জায়গা নয়। এই পৃথিবীতে মানুষের পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য প্রাণী- যাদের প্রত্য...

মা-বাবার প্রয়োজন সন্তানের সঙ্গ, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা
০৫ অক্টোবর ২০২৬

মা-বাবার প্রয়োজন সন্তানের সঙ্গ, ভালোবাসা ও নিরাপত্তা

কোনো কাজে কিংবা একটু আড়াল হলেই মা-বাবা সন্তানদের নিয়ে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। বৃদ্ধ মা হয়তো দরজার দিকে তাক...

ঠোঙা-কাগজে রাস্তার খাবারে অজান্তেই থাকে মারাত্মক বিপদ
০৫ অক্টোবর ২০২৬

ঠোঙা-কাগজে রাস্তার খাবারে অজান্তেই থাকে মারাত্মক বিপদ

বাসে বসে জানালা দিয়ে কেনা আমড়া, শসা কিংবা পেয়ারা মাখা; বিকেলে পথের ধারের ঝালমুড়ি, ছোলা বা ভাজাপোড়া ক...

সাহস জোগানোসহ নিঃস্বার্থভাবে সম্পর্ক রাখে প্রিয় বন্ধু
০৫ অক্টোবর ২০২৬

সাহস জোগানোসহ নিঃস্বার্থভাবে সম্পর্ক রাখে প্রিয় বন্ধু

বন্ধুত্ব জীবনের অন্যতম সুন্দর সম্পর্ক। আনন্দের সময় যেমন একজন ভালো বন্ধু পাশে থাকেন, তেমনি কঠিন সময়েও...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আদালতে হেলমেট ছুড়ে আখতারুজ্জামান বললেন, কেন পরব

রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে নেওয়ার সময় মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক আপনি কি মনে করেন তিনি সঠিক প্রশ্ন করেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে