দেশের সর্বোচ্চ আদালত মনে করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থার জন্য জনসাধারণের ব্যাপক দাবির ফসল।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে দেওয়া রায়ের আপিল ও রিভিউ আবেদনের পর্যবেক্ষণে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এ মত প্রকাশ করেছে।
রিভিউ মঞ্জুর করে দেওয়া আপিল বিভাগের দেওয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত ১২ মার্চ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। রায়ের পর্যবেক্ষণে আপিল বিভাগ বলেছে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ক্ষয় করেনি, বরং সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের ‘পবিত্রতা’ নিশ্চিত করে ‘শক্তিশালী’ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, তা অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ৭ বিচারকের পূর্ণাঙ্গ আপিল বিভাগ ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর এ রায় ঘোষণা করে।
এর মধ্য দিয়ে সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরলেও এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে, যা রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।
বেঞ্চের অপর ৬ বিচারক ছিলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে রায় দিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ ঘটে। সে সময় প্রধান বিচারপতি ছিলেন এ বি এম খায়রুল হক। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০১১ সালের সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন হলে নতুন করে আপিল শুনানির সিদ্ধান্ত নেয় সর্বোচ্চ আদালত। সেই আপিল ও রিভিউ মঞ্জুর করে সর্বসম্মত রায় ঘোষণা করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ।
সেখানে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে দেওয়া রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিষয়ে ‘বিচার বিভাগের আইন প্রণয়ন প্রজ্ঞা এবং সংশোধনমূলক ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করেছে’। একজন প্রধান বিচারপতি ভবিষ্যতে প্রধান উপদেষ্টার পদের আকর্ষণে প্রভাবিত হতে পারেন, যা তার বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। শুধু অনুমানমূলক আশঙ্কার উপর ভিত্তি করে একটি আইন বাতিল করা বিচার বিভাগের আইন প্রণয়ন প্রজ্ঞা এবং সংশোধনমূলক ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ন করে।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী ছিল গণতান্ত্রিক চেতনার এক গভীর শক্তিবৃদ্ধি, যা নিজেই সংবিধানের একটি অলঙ্ঘনীয় মৌলিক কাঠামো। সংশোধনীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে দেখা যায় যে এটি একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে গঠিত ব্যবস্থা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সংশোধনীটি গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হওয়ার একটি পথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অখণ্ডতা নিশ্চিত করার জন্য এর অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সর্বোচ্চ আদালত বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি একটি নিরপেক্ষ, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন হিসেবে তৈরি করা হয়েছে যা এক নির্বাচিত সরকার থেকে অন্য নির্বাচিত সরকারে রূপান্তরের সময় রাষ্ট্রের দৈনন্দিন বিষয়গুলি তত্ত্বাবধান করে। এর প্রাথমিক কাজ হল বর্তমান সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার যাতে না করে তা নিশ্চিত করা, যার ফলে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত হয়।
আপিল বিভাগ বলেছে, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে’ রূপান্তরিত হয়েছিল, যা নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ‘আস্থার গভীর সংকট থেকে’ উদ্ভূত।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে (বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বেঞ্চের) প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ‘ক্ষতি করার জন্য’ ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বাতিল ঘোষণা করে। কিন্তু একই সাথে নবম এবং দশম সংসদ নির্বাচন একই তত্ত্বাবধায়ক কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার অনুমতি দেয়। এই দ্বৈত অবস্থান প্রকাশ করে যে সংখ্যাগরিষ্ঠরাও এই ব্যবস্থাটি বাতিল করার সময় এর অস্থায়ী প্রয়োজনীয়তা এবং গণতান্ত্রিক মূল্য স্বীকার করেছিল।
ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের ‘বিতর্কিত’ রায়ে একটি উল্লেখযোগ্য পদ্ধতিগত অসঙ্গতি চিহ্নিত করার কথা তুলে ধরে এবারের রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০১১ সালের ১২ মে ঘোষিত সংক্ষিপ্ত আদেশে পরবর্তী দুটি সাধারণ নির্বাচন– নবম ও দশম, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্ত দেড় বছরের বেশি সময় পরে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই কার্যকরী অংশটি বাদ দেওয়া বা পরিবর্তন করা হয়েছিল।
বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ মনে করে, ২০১১ সালের সেই রায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের লেখক তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক মৌলিক কাঠামোর একটি বিস্তৃত এবং ‘কিছুটা ব্যক্তিগতকৃত’ ব্যাখ্যার ওপর তার যুক্তি স্থাপন করার চেষ্টা করেছিলেন, এ ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের ‘একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে’ সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংশোধনী একটি উল্লেখযোগ্য এবং বিস্ময়কর সাংবিধানিক অর্জন হিসেবে স্বীকৃত হবে, যা জনগণের স্বাধীন, ন্যায্য এবং নিরপেক্ষভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সার্বভৌম ইচ্ছাকে সমুন্নত রাখার জন্য ‘ডিজাইন’ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে সংবিধানের প্রাধান্য ও জনগণের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সংবিধানকে দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার সাথে সাংঘর্ষিক অন্য কোনো আইন বাতিলযোগ্য বলে গণ্য হয়। রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলছে, ১৪ বছর আগে আপিল বিভাগের দেওয়া রায়টি ‘একাধিক ত্রুটিতে ত্রুটিপূর্ণ’ বলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। সেই রায় সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হল। আপিল বিভাগ বলেছে, সংবিধানের চতুর্থ ভাগের পরিচ্ছদ ২ (ক)-এর নির্দলীয় সরকার-সম্পর্কিত বিধানবলি, যা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইনের ৩ ধারায় সন্নিবেশিত হয়েছিল, এই রায়ের মাধ্যমে তা পুনরুজ্জীবিত ও সক্রিয় করা হল। তবে সর্বোচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সম্পর্কিত বিধানবলি কেবল ‘ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতার’ ভিত্তিতে কার্যকর হবে।
সানা/আপ্র/১৬/৩/২০২৬
আপিল ও রিভিউ আবেদনের পর্যবেক্ষণ
তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনসাধারণের একটি নিরপেক্ষ ব্যবস্থার দাবির ফসল
নিজেস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১:২৫ পিএম, ১৬ মার্চ ২০২৬
| আপডেট: ২২:৫১ এএম ২০২৬
ছবি সংগৃহীত