বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলামের সাজা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে দুটি মানবাধিকার সংগঠন। তাদের দাবি, আবরারকে মারধরের ঘটনায় মোর্শেদের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই। তাই তার দণ্ডাদেশ পর্যালোচনার সময় সাক্ষ্যপ্রমাণ, ব্যক্তিগত অপরাধের দায়, বয়স এবং সাজা কমানোর প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
সংগঠন দুটি হলো ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার (ওএমসিটি) এবং অল ভিকটিমস অ্যান্ড ভেটেরান্স নেটওয়ার্ক (এভিএন)। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ওএমসিটি বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশে কাজ করে। অন্যদিকে বাংলাদেশভিত্তিক এভিএনের স্লোগান ‘রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জনগণের দলিল’। সংগঠনটি নিজেদের পরিচিতিতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরেছে।
আবরার হত্যা মামলায় ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও শুধু মোর্শেদের সাজা পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানোর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন এভিএনের নির্বাহী পরিচালক মুশফিকুর রহমান জোহান। তিনি বলেন, “মোর্শেদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলার নথিপত্র পর্যালোচনার সুযোগ আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে তার পরিবারের লিখিত সম্মতিও নেওয়া হয়েছে। অন্য আসামিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের মামলার নথিপত্র ও আপিলের যুক্তি পেতে দেরি হয়েছে। তাই আপাতত মোর্শেদের মামলাটি নিয়ে বিবৃতি দিয়েছি।”
জোহান আরো বলেন, “আরো কিছু পরিবার নথিপত্র দিয়েছে, সেগুলো দেখে অন্যদের সাজা নিয়েও বিবৃতি দেওয়া হবে।”
আগামী ২৪ নভেম্বর আপিল বিভাগে মোর্শেদের মামলার শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার দুই সংগঠন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, “শুনানিতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার চাপ থেকে মুক্ত থেকে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে।”
বিবৃতিতে আবরার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, তার পরিবারের সত্য জানার, ন্যায়বিচার পাওয়ার এবং দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে শাস্তির কঠোরতা কিংবা জনরোষ প্রশমনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পরিমাপ করা যায় না।
মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে সংগঠন দুটি বলেছে, এ শাস্তি অপরিবর্তনীয় এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। জোহান বলেন, “আমরা সব ধরনের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে। ন্যায়বিচার ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাটা খুব জরুরি। আমাদের চাওয়া তো বেশি কিছু নয়, ন্যায়বিচার।”
২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আবরার ফাহাদকে। এ ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ।
মাত্র ৩৭ দিনে তদন্ত শেষ করে ১৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর মামলার রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে ২০২২ সালের ৬ জানুয়ারি মামলার মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের নথি (ডেথ রেফারেন্স) হাই কোর্টে পাঠানো হয়। অন্যদিকে আসামিরাও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মামলার পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে হাই কোর্টে শুনানি শুরু হয়। একই বছরের ১৬ মার্চ রায় ঘোষণা করেন আদালত। রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামির সবাই বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী। মোর্শেদ ছাড়া বাকি ১৯ জন হলেন মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৭/১১/২০২৬