গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬

মেনু

হৃদয়ের মহাকাব্যিক ইনিংসে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ালো বাংলাদেশ

ক্রীড়া ডেস্ক

ক্রীড়া ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১:২৩ পিএম, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২২:০৬ এএম ২০২৬
হৃদয়ের মহাকাব্যিক ইনিংসে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ালো বাংলাদেশ
ছবি

সিলেট টেস্টে এক মহাকাব্যিক ইনিংস উপহার দিয়েছেন তাওহিদ হৃদয় -ছবি সংগৃহীত

কিছু ইনিংস কেবল রান-সংখ্যায় সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে সাহস, ধৈর্য, দায়িত্ববোধ আর ঘুরে দাঁড়ানোর অবিস্মরণীয় গল্প। সিলেট টেস্টে তাওহিদ হৃদয় তেমনই এক মহাকাব্যিক ইনিংস উপহার দিয়েছেন। একের পর এক রেকর্ড গড়ে দলকে নিশ্চিত বিপর্যয়ের মুখ থেকে টেনে তুলেছেন তিনি। তাঁর অবিশ্বাস্য ব্যাটিংয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৩০ রানের লিড পেয়েছে বাংলাদেশ। যে দল একসময় ১৮৪ রানেই অষ্টম উইকেট হারিয়ে কার্যত খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেই দলের ইনিংস শেষ হয়েছে ৩৮৬ রানে।

২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় ৩৫৯ বলে ২৪২ রান করে অপরাজিত থাকেন হৃদয়। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের রেকর্ড গড়েছেন তিনি। পেছনে ফেলেছেন নিজের আদর্শ ও বগুড়ারই সন্তান মুশফিকুর রহিমকে। শুধু তাই নয়, প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়া বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যানও তিনি। মাত্র নিজের তৃতীয় টেস্টেই এই কীর্তি গড়েছেন হৃদয়। তাঁর ব্যাটে ভর করেই সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের ক্রিকেটে রচিত হলো স্মরণীয় এক অধ্যায়।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ৩৫৬ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে ছিল বাংলাদেশ। আগের দিন ৪০ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৮৮ রান তুলেছিল দল। নতুন দিনে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিললেও একের পর এক উইকেট হারিয়ে আবারো বিপর্যয়ে পড়ে স্বাগতিকরা। মুশফিকুর রহিম ৩৪ রান করে বিদায় নেন। দ্রুত ফিরে যান লিটন দাসও। মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে হৃদয়ের জুটি সম্ভাবনা জাগালেও জাস্টিন গ্রেভসের অসাধারণ ক্যাচে শেষ হয় মিরাজের ইনিংস। এরপর হাসান মাহমুদও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি।

একপর্যায়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ১৮৪ রান। আগেই চোটের কারণে মাঠের বাইরে চলে যাওয়া সাদমান ইসলাম আর ব্যাট করতে পারবেন না, সেটিও নিশ্চিত ছিল। ফলে কার্যত শেষ তিন ব্যাটসম্যানকে নিয়েই লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে হৃদয়কে। এমন পরিস্থিতিতে বড় লিডের স্বপ্ন তো দূরের কথা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের সংগ্রহ ছোঁয়াই কঠিন মনে হচ্ছিল।

কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় হৃদয়ের অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ। এক প্রান্ত আগলে রেখে কখনো রক্ষণাত্মক, কখনো আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে প্রতিপক্ষের বোলারদের দিশেহারা করে দেন তিনি। তাঁকে যোগ্য সঙ্গ দেন তাইজুল ইসলাম ও তাসকিন আহমেদ। অষ্টম উইকেটে তাইজুলের সঙ্গে ১১৭ রানের জুটি গড়েন হৃদয়। এই মাঠে অষ্টম উইকেটে এটিই সর্বোচ্চ রানের জুটি। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে এই উইকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটিও এটি। পরে নবম উইকেটে তাসকিনের সঙ্গে যোগ করেন আরো ৮৫ রান, যা সিলেটের মাঠে এই উইকেটে সর্বোচ্চ।

শেষ দুই উইকেটের জুটিতে বাংলাদেশের সংগ্রহে যোগ হয় ২০২ রান। এর মধ্যে হৃদয়ের একার অবদান ১৬১। শেষ দিকে তাইজুল ও তাসকিনকে আগলে রেখে ব্যাট করেছেন তিনি। অনেক সময় ওভারের চতুর্থ কিংবা পঞ্চম বলে এক রান নিয়ে সতীর্থদের পরের ওভারে আবার ব্যাট করার সুযোগ করে দিয়েছেন। আবার সুযোগ বুঝে চার-ছক্কায় রান তুলেছেন। নিজের মাইলফলকের চেয়ে দলের প্রয়োজনকে বড় করে দেখার এই দায়িত্বশীলতা তাঁর ইনিংসকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।

তাইজুলের সঙ্গে জুটির সময়ই সেঞ্চুরির পথে এগিয়ে যান হৃদয়। আগের দিন ৮০ বলে ২৯ রান নিয়ে অপরাজিত ছিলেন তিনি। সেখান থেকে ১০৯ বলে পূর্ণ করেন অর্ধশতক। এরপর মাত্র ৬২ বলে পৌঁছে যান শতরানে। তাইজুলের বিদায়ের সময় হৃদয়ের সংগ্রহ ছিল ১৭৩। চা-বিরতির ঠিক আগে পরপর একটি চার ও একটি ছক্কা মেরে ১৯০ রানে পৌঁছান। বিরতির পর তাসকিনের সহায়তায় দ্রুত পূর্ণ করেন দ্বিশতক। ৩০৪ বলে ২০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। অর্থাৎ অর্ধশতক থেকে শতরানে যেতে ৬২ বল লাগলেও, শতরান থেকে দ্বিশতকে পৌঁছাতে খেলেছেন মাত্র ১৯৫ বল।

দ্বিশতক পূরণের পরও থামেননি হৃদয়। চার-ছক্কার ঝড় তুলে বাংলাদেশের সংগ্রহকে নিয়ে যান তিন শতাধিক রানের ওপরে। শেষ পর্যন্ত ২৪২ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের নতুন মালিক হওয়ার পাশাপাশি এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ডও নিজের করে নিয়েছেন। এর আগে তামিম ইকবালের সাত ছক্কার রেকর্ড ছিল। হৃদয়ের ১১ ছক্কা সেই রেকর্ডকে অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে। আর একটি ছক্কা মারতে পারলে টেস্টে এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ১২ ছক্কার বিশ্বরেকর্ডেও ভাগ বসাতে পারতেন তিনি।

তবে তাঁর এই কীর্তির পেছনে রয়েছে কঠিন এক প্রত্যাবর্তনের গল্প। এই টেস্ট কিংবা চলতি সিরিজে তাঁর খেলার কথা ছিল না। আগের টেস্টে মুশফিকুর রহিমের চোটের কারণে শেষ মুহূর্তে দলে সুযোগ পান হৃদয়। সেই ম্যাচের দুই ইনিংসেই বাজে শটে আউট হয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। এবার মুমিনুল হক সুস্থ না থাকায় একাদশে জায়গা পান তিনি। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আগের ব্যর্থতার জবাব দিয়েছেন ব্যাট হাতেই। সমালোচনার চাপকে শক্তিতে পরিণত করে নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

আগের দিন ২৯ রানে অপরাজিত থাকা হৃদয়ের ব্যাটিংয়ে দ্বিতীয় দিনের শুরু থেকেই ছিল ভিন্ন তাগিদ। প্রথম ঘণ্টায় মুশফিক ও লিটন বিদায় নেওয়ার পরও তিনি ধৈর্য হারাননি। মিরাজের সঙ্গে জুটি গড়ার সময়ও স্বচ্ছন্দ ছিলেন। মিরাজের বিদায়ের পর তাইজুলকে নিয়ে নতুন করে লড়াই শুরু করেন। তাইজুলের ব্যাটিংয়ে আস্থা পেয়ে নিজের ইনিংস বড় করার পাশাপাশি দলের রানও বাড়াতে থাকেন।

তাইজুলের বিদায়ও ছিল নাটকীয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলার ওয়ারিক্যানের বলে স্টাম্পড হন তিনি। তৃতীয় আম্পায়ার দীর্ঘ সময় রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত দেন। ১১৭ রানের জুটিতে তাইজুলের অবদান ২২, আর হৃদয়ের ৯২ রান। এরপর তাসকিনকে নিয়ে শেষ উইকেটের লড়াইয়ে নামেন হৃদয়। কিন্তু শেষ বিকেলে তাসকিন জেডেন সিলসের শর্ট বলে বড় শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন। ফলে আড়াইশ রানের মাইলফলক ছোঁয়া হয়নি হৃদয়ের। এক ইনিংসে ১২ ছক্কার বিশ্বরেকর্ডেও ভাগ বসানো হয়নি। তবু ২৪২ রানের অপরাজিত ইনিংসেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে নিজের নামটি স্থায়ীভাবে লিখে ফেলেছেন তিনি।

এদিকে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হওয়ার পর ব্যাট করতে নেমে দিনের শেষ পর্যন্ত কোনো উইকেট না হারিয়ে ৭ রান করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তাসকিন আহমেদের প্রথম ওভারেই দুটি জোরালো আবেদন জানায় বাংলাদেশ। আম্পায়ার সাড়া না দেওয়ায় রিভিউ নেয় স্বাগতিকরা, তবে দুটিতেই সফল হয়নি। দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ বিনা উইকেটে ৭ রান। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে ২৩ রানে।

সিলেট টেস্টের ফল জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরো সময়। তবে ম্যাচের ফল যা-ই হোক, হৃদয়ের এই ইনিংস ইতোমধ্যে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। বিপর্যয়ের মুখে কীভাবে দায়িত্ব নিতে হয়, শেষ সারির ব্যাটসম্যানদের নিয়ে কীভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে হয় এবং ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলকে কীভাবে বড় করে দেখতে হয়-তারই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাওহিদ হৃদয়।
সানা/আপ্র/৭/১১/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

হৃদয়ের অপরাজিত ২৪২, লিড নিয়ে থামলো বাংলাদেশ
০৭ নভেম্বর ২০২৬

হৃদয়ের অপরাজিত ২৪২, লিড নিয়ে থামলো বাংলাদেশ

তাওহীদ হৃদয়ের ব্যাটে রচিত হলো বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন ইতিহাস। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ই...

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পন্টিংকে ছাড়ালেন কোহলি
০৭ নভেম্বর ২০২৬

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পন্টিংকে ছাড়ালেন কোহলি

বর্ণাঢ্য ওয়ানডে ক্যারিয়ারে আরো একটি মাইলফলক যুক্ত করলেন ভারতের তারকা ব্যাটার বিরাট কোহলি। নিউজিল্যান...

সিলেটের মাঠে হৃদয়ের রেকর্ড
০৭ নভেম্বর ২০২৬

সিলেটের মাঠে হৃদয়ের রেকর্ড

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের হতাশ করে ছেরেছেন তাওহিদ হৃদয়। যেখানে বাংলাদেশের ব্যাটাররা সবাই একে-একে ব্যর...

তৃতীয় টেস্টেই প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেয়ে গেলেন তাওহিদ হৃদয়
০৭ নভেম্বর ২০২৬

তৃতীয় টেস্টেই প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেয়ে গেলেন তাওহিদ হৃদয়

অভিষেকটা নিশ্চয়ই ভুলে যেতে চাইবেন তাওহিদ হৃদয়। জিম্বাবুয়ে সফরে ম্যাচটা হেরেছিল বাংলাদেশ, নিজেও ভালো...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

গণহত্যাকারীদের আর রাজনীতি করতে দেবে না জনগণ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দেশে গণহত্যা, হত্যাকাণ্ড ও আলেম-ওলামাদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ফ্যাসিবাদী শক্তিকে জনগণ আর রাজনীতি করতে দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া এবং এখনো নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ না করা ব্যক্তিরা বাংলাদেশে ফিরে রাজনীতি করতে পারবেন না। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভায় আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরী মাদ্রাসার ১০৪তম বার্ষিক দ্বীনি মহাসম্মেলন ও দস্তারবন্দী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, মন্ত্রীর এই বক্তব্য সঠিক বলে মনে করেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 20 ঘন্টা আগে