তারেক মাহমুদ: লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন ভূমি অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার কারণে প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের। পাশাপাশি সরকারি কম্পিউটার ও দাপ্তরিক পরিচয়সংকেত ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার উত্তর হামছাদি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে গেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা আবুল কাশেম। অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের ক্যামেরা বন্ধ করতে বলেন এবং নানা ধরনের হুমকি দেন।
এ সময় ওই ভূমি অফিসের সরকারি কম্পিউটারে বসে ব্যক্তিগত পরিচয়সংকেত ব্যবহার করে দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা যায় এক বহিরাগত যুবককে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, ওই যুবককে আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি সেবার অভ্যন্তরীণ পরিচয়সংকেত ব্যবহারের সুযোগ একজন বহিরাগত ব্যক্তির হাতে থাকায় তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই যুবক চেয়ার ছেড়ে চলে যান।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, খাজনা, খতিয়ানসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা নিতে সরকারি ফির বাইরেও অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নিজের কম্পিউটারে দাপ্তরিক কাজ করার কথা থাকলেও অনেক অফিসে অন্য ব্যক্তিদের দিয়ে এসব কাজ করানো হচ্ছে। এতে সেবাগ্রহীতাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের কারণে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। এর সুযোগে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে এবং নানা অনিয়ম ঘটছে।
এদিকে একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বা কর্মস্থল পরিবর্তনের বিষয়ে গত ১ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনায় একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি সময় ধরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) লক্ষ্মীপুরের সদস্য হাবিবুর রহমান সবুজ বলেন, খাজনা ও খতিয়ান করতে গেলে টাকা ছাড়া কাজ হওয়ার নজির খুবই কম। ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্র যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমলনগর উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা ফজলুল কাদের চৌধুরী একই উপজেলায় ১৬ বছর ধরে চাকরি করছেন। এ ছাড়া সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ, জকসিন ও দালাল বাজার এবং রামগঞ্জের পৌর ভূমি অফিস ও পানপাড়াসহ জেলার একাধিক ভূমি অফিসে তিন বছরের বেশি সময় ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মরত রয়েছেন।
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহবুব হাসান বলেন, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির বিষয়ে গত দেড় মাসে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে শিগগিরই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা কার্যকর করা হবে।
ভূমি অফিসে হয়রানি বন্ধ, অতিরিক্ত অর্থ আদায় রোধ এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা। তাঁদের প্রত্যাশা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে ভূমিসেবা আরো সহজ ও হয়রানিমুক্ত হবে।
সানা/আপ্র/৭/১১/২০২৬