চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা একসময় সাধারণ মানুষের জন্য ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রায় ৫০০ বছর ধরে সেখানে প্রবেশের অনুমতি ছিল না সাধারণ নাগরিকদের। তাই ইতিহাসে এটি পরিচিত হয়েছে ‘নিষিদ্ধ নগরী’ বা ‘ফরবিডেন সিটি’ নামে।
ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের এই স্থাপনাটি ছিল চীনের সম্রাটদের আবাসস্থল, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র এবং রাজকীয় রহস্যে ঘেরা এক বিশাল প্রাসাদ নগরী। এখানে সম্রাট, তাঁর পরিবার, রাজকীয় কর্মকর্তা ও বিশেষভাবে অনুমোদিত ব্যক্তিরাই কেবল প্রবেশ করতে পারতেন। অনুমতি ছাড়া প্রবেশের চেষ্টা করলে কঠোর শাস্তির বিধান ছিল, এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।
চীনা ভাষায় এই প্রাসাদের নাম ‘জিজিনচেং’, যার অর্থ ‘বেগুনি নিষিদ্ধ নগরী’। প্রাচীন চীনা বিশ্বাস অনুযায়ী, উত্তর আকাশের তারা ছিল স্বর্গীয় সম্রাটের আবাস। যেহেতু চীনের সম্রাটকে ‘স্বর্গের সন্তান’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাই তাঁর পৃথিবীর আবাসস্থলকেও স্বর্গীয় প্রাসাদের প্রতিরূপ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল।
প্রাসাদটির নির্মাণ শুরু হয় ১৪০৬ সালে। সম্রাট ইয়োংলে রাজধানী নানজিং থেকে বেইজিংয়ে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ১০ লাখের বেশি শ্রমিক ও কারিগর প্রায় ১৪ বছর ধরে কাজ করে এই বিশাল স্থাপনা নির্মাণ করেন। ১৪২০ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়।
মিন ও চিং রাজবংশের সময় ১৪২০ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত মোট ২৪ জন সম্রাট এই প্রাসাদ থেকেই চীন শাসন করেন। ১৯১২ সালে চীনের শেষ সম্রাট পুয়ি সিংহাসন হারানোর পরও তিনি কিছু সময় সেখানে ছিলেন। পরে ১৯২৪ সালে তিনি প্রাসাদ ছেড়ে চলে যান। এরপর ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি সাধারণ মানুষের জন্য জাদুঘর হিসেবে উন্মুক্ত করা হয়।
প্রায় ৭২ হেক্টর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ফরবিডেন সিটিতে রয়েছে ৯৮০টি সংরক্ষিত ভবন এবং মোট ৮ হাজার ৮৮৬টি কক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল, এখানে ৯ হাজার ৯৯৯টি কক্ষ রয়েছে। তবে আধুনিক জরিপে সেই ধারণা সঠিক নয় বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বিশাল এই প্রাসাদ নগরী মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। এর বাইরের অংশ বা ‘আউটার কোর্ট’ ছিল রাজকীয় অনুষ্ঠান, সভা ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের স্থান। আর ভেতরের অংশ বা ‘ইনার কোর্ট’ ছিল সম্রাট, সম্রাজ্ঞী ও রাজপরিবারের ব্যক্তিগত আবাসস্থল।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাচীন কাঠের স্থাপত্যগুলোর একটি এই ফরবিডেন সিটিতে এখনো সংরক্ষিত রয়েছে শত শত বছরের রাজকীয় ঐতিহ্য। এখানে রয়েছে প্রাচীন আসবাবপত্র, চিত্রকর্ম, সিরামিক, জেড পাথরের তৈরি অলংকার এবং রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র।
ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে ফরবিডেন সিটি শুধু একটি প্রাসাদ নয়; এটি চীনের কয়েক শতাব্দীর সাম্রাজ্যিক ইতিহাস, ক্ষমতা ও সভ্যতার এক জীবন্ত স্মারক। সূত্র: এনডিটিভি
সানা/ডিসি/আপ্র/২৭/৭/২০২৬