যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বোঝা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২০২৬ অর্থবছরের শুরুতেই দেশটির অর্থ বিভাগ যে হারে ঋণ নিচ্ছে, তাতে গভীর আর্থিক চাপের আভাস মিলছে। কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট ঘাটতি আরো ১ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
এর অর্থ, গত পাঁচ মাসে প্রতি সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫০ বিলিয়ন বা ৫ হাজার কোটি ডলার করে ঋণ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার।
সম্প্রতি প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি মাসের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুধু গত মাসেই মার্কিন সরকার ৩০৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে।
ঋণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সুদের ব্যয়ও। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ মাসে ঋণের সুদ বাবদ অর্থ বিভাগকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে শুধু সুদ পরিশোধেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। বর্তমানে দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৩৯ লাখ কোটি ডলারের কাছাকাছি।
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস জানিয়েছে, ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি সুদের হার বেশি থাকার কারণে এই ব্যয় বেড়েছে। তবে স্বল্পমেয়াদি সুদের হার কিছুটা কম থাকায় ব্যয়ের চাপ সামান্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
অবশ্য এত বড় ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও গত বছরের তুলনায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যে পরিমাণ ঋণ নিতে হয়েছিল, এবার তার চেয়ে প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার কম ঋণ নিতে হয়েছে।
তবে ঘাটতি কিছুটা কমলেও বাজেট ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা চান-এমন বিশেষজ্ঞরা এখনো আশ্বস্ত নন। কমিটি ফর আ রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগুইনাস সতর্ক করে বলেছেন, চলতি বছরেই ঋণের সুদের খরচ ১ লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং ২০৩৬ সালের মধ্যে তা ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে দেওয়া যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সমস্যা নিজে থেকেই সমাধান হবে না। নীতিনির্ধারকদের ঐকমত্যে পৌঁছে বাজেট ঘাটতি কমাতে হবে। জিডিপির ৩ শতাংশ ঘাটতির লক্ষ্য নির্ধারণ করে জাতীয় ঋণকে একটি টেকসই পথে ফেরানো জরুরি।
অর্থনীতিবিদেরা সাধারণত ঋণের মোট পরিমাণ নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন না হলেও তাদের প্রধান উদ্বেগ ‘ঋণ ও জিডিপির অনুপাত’ নিয়ে। ঋণের বোঝা যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তাহলে সুদ পরিশোধেই রাষ্ট্রের বড় অংশের অর্থ ব্যয় হয়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতির হার জিডিপির প্রায় ৫ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।
২০২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ঘাটতি কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকার কারণ ব্যয় কমানো নয়, বরং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি। শুল্ক থেকে সরকারের আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চার গুণের বেশি বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ব্যক্তিগত আয়কর ও বেতনভিত্তিক কর থেকেও সরকারি কোষাগারে অতিরিক্ত প্রায় ১৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার জমা হয়েছে।
তবে আয়ের পাশাপাশি ব্যয়ও বেড়েছে। এই পাঁচ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বেশি। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা সহায়তা এবং দরিদ্রদের স্বাস্থ্যসেবা-এই তিনটি বড় খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষা ও সাবেক সেনাসদস্যদের কল্যাণ বিভাগেও ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে কৃষি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও শিক্ষা খাতে ব্যয় কিছুটা কমানো হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থাও তাদের ব্যয় প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার কমিয়েছে।
সানা/আপ্র/১৩/৩/২০২৬