মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে চলমান সংঘাত দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ক্রমেই বিস্তৃত হওয়া এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যসহ পুরো বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছে। আকাশপথ, সমুদ্রপথ, জ্বালানি অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটি-সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। যুদ্ধ বন্ধের কোনো সুস্পষ্ট পথ না থাকায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরান ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ না করা পর্যন্ত যুদ্ধ থামবে না। অন্যদিকে ইসরায়েলও ইরান ও লেবাননে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে।
তেহরান ও ইসফাহানে নতুন দফা হামলা: ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের রাজধানী তেহরান ও ইসফাহানে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। ভোর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দর এলাকাতেও বড় ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েল দাবি করেছে, প্রায় ৫০টি যুদ্ধবিমান তেহরানে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা এবং সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কম্পাউন্ডের নিচে থাকা বাঙ্কার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৬ হাজার ৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫ হাজার ৫৩৫টি আবাসিক ভবন, ১ হাজার ৪১টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ১৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র, ৬৫টি বিদ্যালয় এবং ১৩টি রেড ক্রিসেন্ট কেন্দ্র।
ইসরায়েলে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, এখন পর্যন্ত অন্তত ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
এই হামলার ফলে তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষকে রাতভর বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে রাখা।
উপসাগরজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আতঙ্ক: সংঘাত এখন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বাহরাইন জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৪৮টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। সৌদি আরব দাবি করেছে, একটি তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে আসা ছয়টি ড্রোন ও একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। জর্ডানের আকাবা শহরের আকাশেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। কাতার জানিয়েছে, তাদের আকাশে প্রবেশ করা অন্তত নয়টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এদিকে ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল ধাফরা বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে। এতে একটি মার্কিন স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্র ও রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
লেবাননে রাতভর হামলা: ইসরায়েল লেবাননেও হামলা জোরদার করেছে। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকায় হিজবুল্লাহর রকেট লঞ্চার, অস্ত্রভাণ্ডার ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে রাতভর হামলা চালানো হয়েছে।
হিজবুল্লাহর বিশেষ কমান্ডো ইউনিট রাদওয়ান ফোর্সের কয়েকটি কমান্ড সেন্টারও ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল।
চার দিনের মধ্যে লেবাননের অন্তত তিন লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়ের শরণার্থী পরিষদ।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি: ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, নতুন দফার হামলায় তারা হাইপারসনিক ফাতাহ ক্ষেপণাস্ত্র এবং এমাদ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির পাঁচ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে সক্ষম। ইরান আরো দাবি করেছে, তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা: বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেও উত্তেজনা বেড়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী প্রিমা নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক ষষ্ঠাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে প্রায় ৩০০টি তেলবাহী ট্যাংকার ওই এলাকায় আটকা পড়ে আছে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করলে তা লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধাক্কা: পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার ধ্বংস হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা। প্রায় ৩০ কোটি ডলার মূল্যের এই রাডারটি জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে স্থাপন করা ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রাডার ধ্বংস হওয়ায় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
ইসরায়েলকে বিপুল অস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র: সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ইসরায়েলের কাছে ২০ হাজারের বেশি বোমা সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এক হাজার পাউন্ড ওজনের প্রায় ১২ হাজার ভারী বোমা। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে এই অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে।
নিহত প্রায় দেড় হাজার: ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরানে অন্তত এক হাজার ৩৩২ জন নিহত হয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় সেখানে ১২৩ জন নিহত ও ৬৮৩ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলও ইরানের হামলায় তাদের অন্তত ১১ জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে।
যুদ্ধের মধ্যেই ভূমিকম্প: সংঘাতের মধ্যেই ইরানে আবারো ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। শনিবার বন্দর আব্বাসের পশ্চিমে ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব: সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তেলের দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সানা/আপ্র/৭/৩/২০২৬