মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তুলেছে। আকাশপথ, সমুদ্রপথ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং সামরিক ঘাঁটি—সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। এক সপ্তাহের মধ্যেই ইরানে ব্যাপক বোমাবর্ষণ, ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ড্রোন আক্রমণ এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সামরিক সক্রিয়তা সংঘাতকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
তেহরান ও ইসফাহানে নতুন দফা হামলা
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের রাজধানী তেহরান ও ইসফাহানে ‘ব্যাপক আকারে’ নতুন দফা বিমান হামলা শুরু করেছে। ভোর থেকে রাজধানীতে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার তীব্রতায় শহরের আকাশে আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
তেহরানের ব্যস্ত মেহরাবাদ বিমানবন্দর এলাকাতেও বড় ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে সেখানে জ্বলন্ত উড়োজাহাজ ও ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী দেখা যায়। এর আগেও গত ৪ মার্চ এই বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়েছিল।
বেসামরিক স্থাপনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
ইরানের সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৬ হাজার ৬৬৮টি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
* ৫,৫৩৫টি আবাসিক ভবন
* ১,০৪১টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান
* ১৪টি চিকিৎসা কেন্দ্র
* ৬৫টি বিদ্যালয়
* ১৩টি রেড ক্রিসেন্ট কেন্দ্র
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মীও আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইসরায়েলে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
অন্যদিকে ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, এখন পর্যন্ত অন্তত ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
এই হামলার কারণে তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষকে রাতভর বাংকারে আশ্রয় নিতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য হলো বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে রাখা এবং তাদের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমিয়ে দেওয়া।
উপসাগরজুড়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আতঙ্ক
সংঘাত এখন ইসরায়েল–ইরান সীমা ছাড়িয়ে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
* বাহরাইনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তারা ৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৪৮টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
* সৌদি আরব দাবি করেছে, একটি তেলক্ষেত্র লক্ষ্য করে আসা ছয়টি ড্রোন এবং একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
* জর্ডানের আকাবা শহরের আকাশেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে।
* কাতার জানিয়েছে, তাদের আকাশে প্রবেশ করা অন্তত নয়টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোতে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজছে এবং সাধারণ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি ও সমুদ্রপথে উত্তেজনা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ **হরমুজ প্রণালির** কাছেও উত্তেজনা বেড়েছে। সেখানে একটি মাল্টার পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাংকারে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)।
এদিকে ইরাকের বসরায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর স্থাপনা লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যাতে আগুন ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক শক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা
সংঘাত ক্রমেই আন্তর্জাতিক মাত্রা পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের কাছে প্রায় **১৫ কোটি ডলার মূল্যের জরুরি অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন** দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ইতোমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য সৌদি আরবের নিরাপত্তায় যুদ্ধবিমান ও নৌবাহিনীর সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
উত্তেজনা কমানোর বার্তা তেহরানের
সংঘাতের মধ্যেও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে হামলা না হলে তাদের বিরুদ্ধে আর আক্রমণ চালানো হবে না। সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে দুঃখপ্রকাশও করেছেন।
অনিশ্চয়তার মুখে পুরো অঞ্চল
সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশপথে চলাচলও ব্যাহত হয়েছে। এক সপ্তাহ বন্ধ থাকার পর কাতার সীমিত পরিসরে আকাশপথ খুলে দিয়েছে; আপাতত শুধু জরুরি ও কার্গো ফ্লাইট চলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। যুদ্ধের মাত্রা আরও বাড়লে এই সংঘাত পুরো অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সানা/আপ্র/৭/৩/২০২৬