জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কূটনীতিক লানা নুসায়বেহকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ সরকারের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। তবে যুক্তরাজ্য এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
নুসায়বেহ নির্বাচিত হলে তিনি হবেন জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম নারী মহাসচিব এবং মিসরের বুট্রোস বুট্রোস-ঘালির পর দ্বিতীয় আরব মহাসচিব। কিন্তু তাঁর প্রার্থিতা ঘিরে ইতিমধ্যে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সুদানের গৃহযুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূমিকা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এসব বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
সুদানের আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা ওই বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গণহত্যার সুস্পষ্ট লক্ষণ থাকার কথা জানিয়েছেন। তবে আমিরাত সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির একজন কূটনীতিককে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করাই তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার। প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করবে না যুক্তরাজ্য।
যুক্তরাজ্য-আমিরাত সম্পর্কের হিসাবও কি রয়েছে
নুসায়বেহকে সমর্থনের সম্ভাবনাকে শুধু জাতিসংঘের নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয় হিসেবে দেখছেন না পর্যবেক্ষকেরা। এর সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের যোগসূত্রও আলোচনায় এসেছে।
ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবকে ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে। ক্লাবটির মালিকানার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্য ও দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক এক তদন্তে ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে ৮ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের বেশি অবৈধ অর্থায়নের তথ্য গোপন এবং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ১১৪টি আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠে এসেছে। ক্লাবটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রিমিয়ার লিগের পদক্ষেপের জেরে আমিরাতের কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ বাতিলের হুমকি দিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে নুসায়বেহকে সমর্থন করলে আবুধাবির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তবে যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তের পেছনে এই কূটনৈতিক হিসাব কতটা কার্যকর, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
কে এই লানা নুসায়বেহ
১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া লানা নুসায়বেহ সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তিনি ইউনেসকোর পরামর্শক এবং গলফ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। পরে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতি পরিকল্পনা বিভাগের প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক হন।
২০১৩ সালে তিনি জাতিসংঘে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রথম নারী স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি, জাতিসংঘের নারী উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি এবং দুবার নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
নুসায়বেহর পারিবারিক শিকড় ফিলিস্তিনে। তাঁর পরিবার জেরুজালেমের বাসিন্দা। তাঁর দাদা আনোয়ার নুসায়বেহ ছিলেন বিশিষ্ট ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম যখন জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন তিনি দেশটির বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। যুক্তরাজ্যে জর্ডানের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি।
নুসায়বেহ যুক্তরাজ্যের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে ইসরায়েলবিষয়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক কলিন শিন্ডলার তাঁর শিক্ষক ছিলেন। শিন্ডলারের ভাষ্য অনুযায়ী, নুসায়বেহ ইসরায়েলবিষয়ক গবেষণায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ইসরায়েলের ইতিহাস ও জায়নবাদ নিয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধেরও প্রশংসা করেছেন শিন্ডলার। তাঁর মতে, ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে ২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তির ক্ষেত্রে নুসায়বেহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
তবে ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্ক নিয়ে নুসায়বেহর অবস্থানও আলোচনার বিষয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরায়েল যখন পশ্চিম তীরের কিছু অংশ নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করছিল, তখন নুসায়বেহ বলেছিলেন, আমিরাত ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের মাধ্যম হিসেবেই এসব চুক্তিকে দেখে। তিনি ইসরায়েল সরকারকে ওই পরিকল্পনা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব পদে প্রার্থিতা ঘোষণার সময় নুসায়বেহ বলেন, জরুরি ভিত্তিতে কাজ করা, মতপার্থক্য সত্ত্বেও মানুষকে একত্র করা এবং কার্যকর ফল অর্জন না হওয়া পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মহাসচিব নির্বাচনে অনিশ্চয়তা
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা পরিষদকে ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের জন্য একজন প্রার্থীর নাম সুপারিশ করতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নুসায়বেহর প্রার্থিতা সামনে আসার আগে ছয় দফা অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি হয়েছে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ স্থায়ী সদস্য - যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স - কোনো প্রার্থীর বিষয়ে একমত হতে পারেনি। নতুন প্রার্থিতা যুক্ত হওয়ায় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সমীকরণ কীভাবে বদলাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সুদানের যুদ্ধ ও আমিরাতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
নুসায়বেহর প্রার্থিতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো সুদানের গৃহযুদ্ধে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথিত ভূমিকা। দেশটির আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস এবং সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষের ওপর নৃশংসতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, দুই পক্ষের ১৫ জন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতাসহ বিভিন্ন নৃশংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।
সুদানের আল ফাশারে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের এক বছর পর যুক্তরাজ্যের এ পদক্ষেপের কথা জানানো হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত তদন্তে সুদানের মানুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। তাঁর ভাষায়, এসব মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া দেশগুলোর সহায়তা বন্ধ করতে হবে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের বিরুদ্ধে দারফুরে অ-আরব জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত নিধনসহ গুরুতর অপরাধের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণে বাহিনীটিকে আমিরাতের অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়ার অভিযোগও এসেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার এবং নুসায়বেহ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনে নুসায়বেহর প্রার্থিতা কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের যোগ্যতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, সুদানের যুদ্ধ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আমিরাতের সম্পর্কের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হবেন কি না, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন ও সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের ওপর। তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই
সানা/আপ্র/২৮/১০/২০২৬