কৈশোরে এক সড়ক দুর্ঘটনায় বুকের নিচ থেকে অবশ হয়ে যাওয়া এক গবেষক এখন শুধুই ভাবনার মাধ্যমে কম্পিউটারে সুর তৈরি করছেন। মস্তিষ্কে স্থাপন করা বিশেষ চিপের সাহায্যে এই অসাধারণ কাজ সম্ভব হচ্ছে, যা শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকেই নয়, মানব সৃজনশীলতার নতুন সম্ভাবনাকেও সামনে আনছে।
৬৯ বছর বয়সী গবেষণা মনোবিজ্ঞানী গ্যালেন বাকওয়াল্টার দীর্ঘদিন ধরে চতুরঙ্গ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত। ২০২৪ সালে নিজের মাথায় অস্ত্রোপচার করাতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি তিনি। তার লক্ষ্য ছিল-নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার পাশাপাশি একই অবস্থায় থাকা অন্যদের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করা।
তার মস্তিষ্কে স্থাপন করা ছয়টি চিপ স্নায়ুর সংকেত শনাক্ত করে এবং নড়াচড়ার ইচ্ছাকে অনুবাদ করতে পারে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি শুধু চিন্তা দিয়েই কম্পিউটার পরিচালনা করতে সক্ষম নন, বরং হারিয়ে যাওয়া আঙুলের অনুভূতির কিছু অংশও ফিরে পেয়েছেন।
এই প্রযুক্তির সহায়তায় এখন তিনি সুর সৃষ্টি করছেন। মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের সংযোগভিত্তিক এই পদ্ধতির মাধ্যমে তার চিন্তার সংকেত সরাসরি সুরে রূপান্তরিত হচ্ছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক একটি পাঙ্ক ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে সংগীতের সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ক্যালটেকের এক গবেষকের সঙ্গে কাজ করে তিনি এমন একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, যা মস্তিষ্কের সংকেতকে সুরের ওঠানামার সঙ্গে যুক্ত করে।
তিনি জানান, শরীরের কোনো অঙ্গ নাড়ানোর চিন্তা করলেই মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় হয়। সেই সংকেতকে সুরের উচ্চতা বা নিম্নতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে তিনি চিন্তার মাধ্যমে সুর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন।
বর্তমানে তিনি একসঙ্গে দুটি ভিন্ন সুর তৈরি করতে সক্ষম হলেও এর বেশি হলে বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, এটি একসঙ্গে দুটি ভিন্ন কাজ করার মতোই কঠিন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি ভার্চুয়াল কিবোর্ডও তৈরি করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রায় সংকেত পৌঁছালে সুর বাজে এবং কমে গেলে তা থেমে যায়। ধীরে ধীরে এটি বাস্তব বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুভূতি তৈরি করছে। তবে এই পদ্ধতি আয়ত্ত করা সহজ নয়। প্রতিদিন একই স্নায়ু সক্রিয় থাকে না, ফলে নতুন করে শনাক্ত করতে হয় কোন সংকেত কীভাবে কাজ করছে। তা নিয়ন্ত্রণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই গবেষক মনে করেন, প্রযুক্তির লক্ষ্য শুধু শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া নয়-এটিকে মানুষের জন্য আনন্দদায়কও হতে হবে। তার মতে, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের জীবনকে আরো অর্থবহ ও উপভোগ্য করার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমবার মস্তিষ্কের সংকেতকে দৃশ্যমানভাবে দেখে তিনি বিস্মিত হন। নিজের চিন্তার ফলে হঠাৎ সুর বেজে ওঠার অভিজ্ঞতাকে তিনি “অবিশ্বাস্য” বলে বর্ণনা করেন। ইতিমধ্যে তার তৈরি সুর একটি গানে ব্যবহৃত হয়েছে। ভবিষ্যতে পুরো একটি গান শুধুমাত্র মস্তিষ্কের মাধ্যমে তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তিনি স্বীকার করেন, তার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন হবে না। তবে এই প্রযুক্তি তাকে নতুনভাবে সৃষ্টিশীল হওয়ার শক্তি দিয়েছে। তার কথায়, এই অভিজ্ঞতা শুধু প্রযুক্তিগত অর্জন নয়-এটি নতুন জীবনবোধের উৎস।
সানা/ডিসি/আপ্র/৩১/৩/২০২৬