বয়স বৃদ্ধি ও বংশগত ইতিহাস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ধূমপান বর্জন এর মধ্যে অন্যতম।
মার্কিন চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দৈনন্দিন অভ্যাসে সচেতন পরিবর্তন এনে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়। বোস্টনের চিকিৎসক এবং হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের সহযোগী সম্পাদক ডা. মল্লিকা মার্শালের মতে, কিছু পরিচিত স্বাস্থ্যগত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে স্ট্রোক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।
১. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। এটি মস্তিষ্কের রক্তনালির ক্ষতি করতে পারে এবং রক্তনালিতে বাধা বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
লবণ গ্রহণ কমানো, শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। সাধারণভাবে রক্তচাপ ১২০/৮০ মিলিমিটার পারদের কাছাকাছি রাখাকে আদর্শ ধরা হয়। তবে ব্যক্তিভেদে লক্ষ্যমাত্রা ভিন্ন হতে পারে। লবণ কমানোর ক্ষেত্রে দৈনিক মোট সোডিয়াম গ্রহণের পরিমাণ বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
২. শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমানো
অতিরিক্ত ওজন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়, যা স্ট্রোকের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই সুষম খাবার গ্রহণ, পরিমিত পরিমাণে খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা প্রয়োজন।
ওজন কমানোর জন্য সবার ক্ষেত্রে একই পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণের নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বয়স, শারীরিক গঠন, দৈনন্দিন কাজ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত।
৩. নিয়মিত ব্যায়াম করা
শারীরিক পরিশ্রম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা সাঁতারের মতো মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম এ ক্ষেত্রে কার্যকর।
সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। ব্যায়ামের সময় এমন গতি বজায় রাখা ভালো, যাতে কিছুটা দ্রুত শ্বাস নিতে হলেও কথা বলা সম্ভব হয়। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর ব্যায়াম শুরু করলে নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় ও পরিশ্রম বাড়ানো উচিত।
৪. মদ্যপান এড়িয়ে চলা
অতিরিক্ত মদ্যপান রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। বিশেষ করে নিয়মিত অতিরিক্ত পরিমাণে অ্যালকোহল গ্রহণ হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে মদ্যপান এড়িয়ে চলা নিরাপদ সিদ্ধান্ত। পাশাপাশি ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো অন্যান্য ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
৫. হৃদ্স্পন্দনের অনিয়মের চিকিৎসা নেওয়া
হৃদ্যন্ত্রের বিশেষ এক ধরনের ছন্দের সমস্যা অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। এ সমস্যায় হৃদ্যন্ত্রের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত মস্তিষ্কের রক্তনালিতে পৌঁছে রক্তপ্রবাহ বন্ধ করে দিলে স্ট্রোক হতে পারে।
হৃদ্স্পন্দন অনিয়মিত হওয়া, বুকে ধড়ফড়ানি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। রোগ নির্ণয়ের পর প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ বা অন্য চিকিৎসা দেওয়া হয়। রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধের ওষুধ সবার জন্য এক নয়; চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা উচিত নয়।
৬. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা
রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। এতে স্ট্রোকসহ বিভিন্ন হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। ওষুধের মাত্রা নিজে থেকে পরিবর্তন না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
৭. ধূমপান ও ভ্যাপিং বর্জন করা
ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি করে, রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায় এবং ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তাই স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করা জরুরি। ভ্যাপিংকেও নিরাপদ বিকল্প মনে করা উচিত নয়। প্রয়োজনে ধূমপান ছাড়তে চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসেবার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন, দ্রুত হাসপাতালে নিন
স্ট্রোক হলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ চেনার সহজ উপায় হিসেবে ‘ফাস্ট’ পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।
- মুখের পরিবর্তন: হাসতে বললে মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া বা ঝুলে পড়া।
- হাতের দুর্বলতা: দুই হাত তুলতে বললে এক হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া বা নিচে নেমে আসা।
- কথায় সমস্যা: কথা জড়িয়ে যাওয়া, অস্পষ্টভাবে কথা বলা বা কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া।
- সময় নষ্ট নয়: এসব লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দিলেই দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
এ ছাড়া শরীরের এক পাশ হঠাৎ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, আকস্মিক দৃষ্টিসমস্যা, ভারসাম্য হারানো কিংবা অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। লক্ষণ কিছুক্ষণ পর সেরে গেলেও অবহেলা করা যাবে না। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে; নিজে থেকে ওষুধ খাওয়ানো বা লক্ষণ সেরে যাওয়ার অপেক্ষা করা বিপজ্জনক।
স্ট্রোকের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সব সময় সম্ভব নয়। তবে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সানা/আপ্র/২৯/১০/২০২৬