অতিরিক্ত লবণ খেলে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে - এ কথা অনেকেরই জানা। তবে লবণের অন্যতম উপাদান সোডিয়াম যকৃতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ যকৃতে চর্বি বিপাকের প্রক্রিয়া, প্রদাহ এবং ক্ষতির ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে মানুষের ওপর আরো গবেষণা প্রয়োজন, তবু যকৃতের সুস্থতা বজায় রাখতে প্রতিদিনের খাবারে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
যেভাবে ক্ষতি করতে পারে: সোডিয়াম শরীরের তরলের ভারসাম্য, স্নায়ুর কার্যক্রম ও পেশির স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণ করলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব কেবল কিডনি ও হৃদ্যন্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, যকৃতের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কেক মেডিসিনের যকৃত বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান পি লির মতে, সোডিয়াম রক্তচাপ, শরীরে তরলের ভারসাম্য, ইনসুলিনের কার্যকারিতা এবং অন্ত্রের অণুজীবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব পরিবর্তন পরোক্ষভাবে যকৃতের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একটি গবেষণায় অতিরিক্ত চর্বি ও সোডিয়ামসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে যকৃতে প্রদাহ এবং ক্ষত তৈরির ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণাটি ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হওয়ায় মানুষের ক্ষেত্রেও একই প্রভাব পড়ে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যকৃতে চর্বি জমার পাশাপাশি সেই চর্বির সঙ্গে প্রদাহ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ যকৃতের কোষের ক্ষতি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে ক্ষত তৈরি হলে তা থেকে সিরোসিসসহ গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে অতিরিক্ত লবণ সরাসরি এসব রোগের কারণ - এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
চর্বিযুক্ত যকৃতের রোগে বাড়তি সতর্কতা: বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত চর্বিযুক্ত যকৃতের রোগে যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমে। এ রোগের ঝুঁকির সঙ্গে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, ইনসুলিন প্রতিরোধ এবং রক্তে চর্বির অস্বাভাবিক মাত্রার সম্পর্ক রয়েছে। শরীরের ওজন স্বাভাবিক থাকলেও কারও কারও এ রোগ হতে পারে।
আগে থেকেই যকৃতের সমস্যা থাকলে খাদ্যাভ্যাসের বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে রোগের অগ্রগতি ঘটলে যকৃতের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। সিরোসিসের জটিল পর্যায়ে শরীরে সোডিয়াম ও পানির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে পেট, পায়ের পাতা এবং গোড়ালিতে তরল জমতে পারে। এ অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সোডিয়াম গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
গুরুতর যকৃতের রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীকে দৈনিক দুই হাজার মিলিগ্রামের কম সোডিয়াম গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে কতটুকু সোডিয়াম গ্রহণ করা উচিত, তা রোগীর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে।
কতটুকু লবণ খাবেন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন পাঁচ গ্রামের কম লবণ গ্রহণ করা উচিত। এটি প্রায় এক চা-চামচের সমপরিমাণ, যেখানে রান্না ও খাবারের সঙ্গে গ্রহণ করা মোট লবণ হিসাব করতে হবে। মনে রাখতে হবে, লবণ ও সোডিয়াম এক নয়। পাঁচ গ্রাম লবণে প্রায় দুই হাজার মিলিগ্রাম সোডিয়াম থাকে।
অতিরিক্ত লবণ এড়াতে শুধু খাবারের ওপর থেকে লবণ কমালেই চলবে না। প্যাকেটজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস, পনির, সস, আচার, কৌটাজাত স্যুপ এবং রেস্তোরাঁর খাবারেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম থাকতে পারে। তাই খাবার কেনার সময় মোড়কে উল্লেখ করা উপাদান ও সোডিয়ামের পরিমাণ দেখে নেওয়া ভালো।
যকৃত সুস্থ রাখতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন: যকৃতের সুস্থতা বজায় রাখতে তাজা শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, ডিম, পরিমিত পরিমাণে মাংস এবং লবণ ছাড়া বাদাম খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। বাড়িতে তাজা উপকরণ দিয়ে রান্না করলে খাবারে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। স্বাদ বাড়াতে অতিরিক্ত লবণের পরিবর্তে লেবু, ধনেপাতা ও অন্যান্য মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে।
পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, মদ্যপান এড়িয়ে চলা এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। যকৃতের রোগের ঝুঁকি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, লবণ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও অতিরিক্ত গ্রহণের কোনো সুফল নেই। পরিমিত লবণ গ্রহণ ও সুষম খাদ্যাভ্যাস উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক। যকৃতের সুস্থতা বজায় রাখতে তাই আজ থেকেই খাবারে লবণের পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
সানা/আপ্র/২৯/১০/২০২৬